প্রধানমন্ত্রীর ‘অসাবধানতাজনিত’ মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক

মওলানা ভাসানীর নির্দেশেই জিয়ার হাতে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক হস্তান্তর হয়

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

“১৯৭৯ সালের নির্বাচনের সময় মওলানা ভাসানী জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন- ‘তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম’।” বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পয়লা বৈশাখে টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত শেষে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি- বক্তব্যটি মূলত ঐতিহাসিক বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করলেও সেখানে সামান্য তথ্যগত অসঙ্গতি ছিল, যা ‘অসাবধানতাজনিত’ ভুল হিসেবে দেখা উচিত।

সমালোচকরা বলছেন, মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালে ইন্তেকাল করেন; ফলে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সরাসরি এমন বক্তব্য দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, বক্তব্যটির মর্মার্থ ছিল ভিন্ন- ভাসানীর রাজনৈতিক নির্দেশনা ও ধারাবাহিকতার মাধ্যমেই ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি পরে জিয়াউর রহমানের হাতে পৌঁছায়।

পাকিস্তান আমলে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী নিজ প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) জন্য ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বেছে নেন। কৃষক-শ্রমিকনির্ভর রাজনীতির প্রতীক হিসেবে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হলেও ভাসানী নেতৃত্বাধীন অংশ এই প্রতীক ধরে রাখে এবং ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও এটি ব্যবহার করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জীবনের শেষ পর্যায়ে ভাসানী তার ঘনিষ্ঠ সহচর মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে নির্দেশ দেন- তার মৃত্যুর পর অনুসারীদের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে, যা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সক্ষমতা রাখবে। এ ক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথাও বলেন।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ভাসানীর মৃত্যুর পর যাদু মিয়া ন্যাপের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং তার নির্দেশিত পথ অনুসরণে রাজনৈতিক ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু করেন।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে নীলফামারীর ডোমারে এক জনসভায় যাদু মিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেন। ওই প্রতীক নিয়েই ৩ জুন ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে জিয়া বিজয়ী হন।

পরে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠনের পর ন্যাপের বড় একটি অংশ যাদু মিয়ার নেতৃত্বে নতুন দলে যোগ দেয় এবং ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি বিএনপির স্থায়ী প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

একটি জনসভায় জিয়াউর রহমান নিজেও যাদু মিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আপনাদের সন্তান যাদু মিয়া ধানের শীষ আমাদের উপহার দিয়েছেন”- যা এই প্রতীক হস্তান্তরের রাজনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, ১৯৭৫ সালে সেনাপ্রধান থাকাকালে জিয়াউর রহমান একাধিকবার সন্তোষে ভাসানীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এক সাক্ষাতে ভাসানী ধানের শীষের ছড়া দিয়ে তাকে বরণ করেন- যা অনেকের কাছে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত।

টাঙ্গাইলের রাজনীতিক হামিদুল হক মোহনের স্মৃতিচারণে উঠে আসে, মৃত্যুর আগে ভাসানী যাদু মিয়াকে বলেন- ন্যাপ দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়; বৃহত্তর একটি দল গঠন করতে হবে এবং জিয়াউর রহমানের সাথে সমন্বয় করতে হবে। তিনি জিয়াকে “সৎ, দেশপ্রেমিক ও পরিশ্রমী” হিসেবেও উল্লেখ করেন।

এই নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরে ন্যাপসহ কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয় এবং সেই প্রক্রিয়া থেকে বিএনপির উত্থান ঘটে।

ভাসানীর নাতি আজাদ খান ভাসানীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য ছিল- ভাসানীর নির্দেশিত রাজনৈতিক ধারার ফল হিসেবেই ‘ধানের শীষ’ জিয়ার হাতে যায়।

বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতাও একই মত প্রকাশ করে বলেন, “ভাসানী সরাসরি প্রতীক দেননি, কিন্তু তার নির্দেশনা ছাড়া এই প্রতীক হস্তান্তর সম্ভব হতো না।”

সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ধানের শীষ’ প্রতীক সরাসরি মওলানা ভাসানীর হাত থেকে জিয়াউর রহমানের কাছে যায়নি- বরং তার রাজনৈতিক নির্দেশনা ও উত্তরসূরিদের মাধ্যমে তা হস্তান্তরিত হয়েছে।

অতএব, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভুল না বলে বরং ঐতিহাসিক বাস্তবতার একটি সরলিকৃত উপস্থাপন হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে সময়সংক্রান্ত একটি অসাবধানতামূলক ত্রুটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।