ইউএনওর অনুমতিতে উজাড় হচ্ছে ৩০ একরের সংরক্ষিত বনভূমি

ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে যে ম্যানগ্রোভ, ঝাউ আর গোলপাতার বাগান প্রাকৃতিক ঢালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। তরমুজ আবাদ করার জন্য সেই বনভূমিতে চলছে নির্বিচারে গাছ কাটা, মাটি কাটাকাটি আর জমির শ্রেণি পরিবর্তন। মাত্র দুই সপ্তাহেই গোটা এলাকার চিত্র বদলে গেছে।

Printed Edition
ভেকু দিয়ে মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে
ভেকু দিয়ে মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে |নয়া দিগন্ত

মাহমুদ হাসান রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

উপকূলের ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে যে ম্যানগ্রোভ, ঝাউ আর গোলপাতার বাগান প্রাকৃতিক ঢালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। তরমুজ আবাদ করার জন্য সেই বনভূমিতে চলছে নির্বিচারে গাছ কাটা, মাটি কাটাকাটি আর জমির শ্রেণি পরিবর্তন। মাত্র দুই সপ্তাহেই গোটা এলাকার চিত্র বদলে গেছে।

এই বন উজাড় হচ্ছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের নতুন কাউখালী চরের পশ্চিমাংশের চর সাইনবোর্ড এলাকায়। সরকারি গেজেটভুক্ত উপকূলীয় বনায়নের মধ্যে থাকা এই ৩০ একর জমি গত ১৬ অক্টোবর “এক বছরের জন্য চাষাবাদের উপযোগী খাস জমি” দেখিয়ে অনুমতি দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ। বন বিভাগের আপত্তি সত্ত্বেও সেই অনুমতি বহাল থাকে। উপকূলীয় বন বিভাগ বন বাঁচাতে আইনি সহায়তা চেয়ে থানা পুলিশের ধারস্থ হলেও অজ্ঞাত কারনে পুলিশ সেবা দেয়নি।

গত ১৭ নভেম্বর থেকে তিনটি এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে বনায়ন উজাড় শুরু হয়। ১৮ নভেম্বর সকালে বন বিভাগ বাধা দিয়েছিল, কিন্তু কাজ বন্ধ হয়নি। বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, ঝাউ ও ম্যানগ্রোভ গাছের কাণ্ড নদীতে ফেলে রাখা হয়েছে। বাগানের ওপর দিয়ে নতুন বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে। এখন বালুচরে মাটি উল্টে ফেলে রাখা ভেকুর চিহ্ন আর কাটা গাছের গুঁড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। অথচ শীত মওসুমে এই বনায়নে প্রতিবছর হাজারো অতিথি পাখি আশ্রয় নেয়।

স্থানীয়রা বলছেন, এই বন দখল এবং উজাড়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা কাজী জাহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ দালাল মানিক মোল্লা। মানিকের তদবির এবং ঘুষ লেনদেনেই ইউএনওর থেকে অনুমতিপত্র বের করা হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য বলছে, আগুনমুখা ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা নতুন কাউখালী এবং মালার চরের ১ হাজার ৮৭ একর এলাকা ২০১৫ সালে গেজেটভুক্ত বনভূমি। ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকে এখানে ঝাউ, সুন্দরী, গোলপাতা, বাইনসহ নানা প্রজাতির বনায়ন চলছে। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে ম্যানগ্রোভ ও ঝাউ বাগান করেছে বন বিভাগ। এই গেজেটভুক্ত বনভূমির মাঝেই এখন “খাস জমি” দেখিয়ে চাষের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস দাবি করছে এ জমি তাদের কৃষি খাস জমি।

রাজীব দাশ পুরকায়স্থ স্বাক্ষরিত অনুমতিপত্রে লেখা হয়েছে চর ইমারশন মৌজার উত্তরের দিকে “নতুন জেগে ওঠা চরের ৩০ একর কৃষি খাস জমি” এক বছরের জন্য চাষাবাদের অনুকূলে ২৫ জন ভূমিহীন কৃষককে দেয়া হয়েছে। অনুমতিপত্রে ছয়টি শর্তও উল্লেখ করা হয়। তবে কতটাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে চিঠিতে তা উল্লেখ নেই। অনেকটা নিয়মবহির্ভূত অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পত্রে যাদের নাম আছে তাদের কেউই মাঠে নেই। রয়েছে মানিক মোল্লাসহ তার সহযোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, যাদের ভূমিহীন উল্লেখ করে অনুমতি দেয়া হয়েছে তারা সবাই সচ্ছল। ইউএনও বলছে অনুমতি দেয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসক অবগত রয়েছে, তবে জেলা প্রশাসক বলছেন তিনি এসবের কিছুই জানেন না।

বনভূমি দখলের নেতৃত্বে থাকা মানিক মোল্লা বলেন, ৩০ একর জমি চাষের অনুমতির জন্য ৭ লাখ টাকা চুক্তি হয়েছিল ইউএনও-তহশিলদারের সাথে। ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এখন দেয়া হয়েছে অবশিষ্ট টাকা তরমুজের বীজ লাগানোর পরে দেয়ার কথা। টাকা দেয়ার সময় আমি ছিলাম না। কাউখালী ফরেস্ট ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল আহম্মেদ খান বলেন, খবর পেয়ে গিয়ে দেখি ভেকু দিয়ে বাগানের গাছ কেটে নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। তারা ইউএনওর অনুমতিপত্র দেখায়। ইউএনওকে জানালেও তিনি আমাদের আপত্তি গুরুত্ব দেননি। তহশিলদারও ফোনে অসাদাচরণ করে বলেন, এ জমি ইউএনও ইজারা দিয়েছেন; বন বিভাগের এখতিয়ার নেই। মানিক মোল্লা সরাসরি বলেছে তহশিলদার আর ইউএনও মহোদয় অনুমতি দিয়েছেন। জানা যায়, এই বনায়নে প্রচুর অতিথি পাখি আসে। বন দখল হওয়ায় তারা আশ্রয় হারাচ্ছে।

উপকূলীয় বন বিভাগ রাঙ্গাবালী রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বনভূমি দখলে বাধা দিলে ইউএনও আমাকে বলেন ওখানে কেনো গেলেন এটি আমার জায়গা। পরে তার সাথে গেজেট ও কাগজপত্র নিয়ে দেখা করি। তিনি তা উপেক্ষা করেন। রাঙ্গাবালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ বলেন, বিষয়টি শুনেছি। বন বিভাগের গেজেট ও কাগজপত্র দেখে ব্যবস্থা নেবো।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বনায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মাসুদুর রহমান বলেন, বনভূমি ধ্বংসের কারণে উপকূলের সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে। উষ্ণায়ন, লবণাক্ততার বিস্তার এবং জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বাড়বে। প্রশাসন-বন বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, চাষাবাদের জন্য এক বছরের অনুমতিপত্র দেয়ার বিষয়ে ইউএনও আমাকে অবহিত করেননি। বন উজাড়ের ঘটনা জেলা বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বিষয়টি জানানোর পর সংশ্লিষ্ট ইউএনওকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।