অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিক পতনের পর অবশেষে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পুঁজিবাজার। গতকাল সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারই সূচকের কমবেশি উন্নতি দিয়ে দিন শেষ করেছে। গতকাল বাজারগুলোতে দিনের শুরু হয়েছিল সূচকের বড় উন্নতি দিয়ে। তবে লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টার মাথায় বাজারে বিক্রয়চাপ শুরু হলে সূচকের বৃদ্ধি পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি বাজারগুলো। তবে অন্য দিনগুলোর চেয়ে বিক্রয়চাপ সহনীয় হওয়ায় সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয় দুই বাজার।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৩ দশমিক ২৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। চার হাজার ৮৭২ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় চার হাজার ৯০৬ দশমিক ২৯ পয়েন্টে। সকালে প্রথম এক ঘণ্টা সূচকটির বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। এ সময় ডিএসই সূচক পৌঁছে যায় চার হাজার ৯২৬ পয়েন্টে। কিন্তু পরবর্তিতে বিক্রয়চাপ সক্রিয় হলে ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হতে থাকে সূচক। তবে আগের দিনগুলোর মতো বিক্রয়চাপের তীব্রতা না থাকায় পতন সামলে নিতে সক্ষম হয় বাাজরটি। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৮৩ ও ৬ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গতকাল সূচকের মিশ্র আচরণ দেখা যায়। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই ও সিএসসিএক্স সূচক যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭৪ ও ৮ দশমিক ২৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে পারলেও ৭ দশমিক ২৫ পয়েন্ট অবনতি ঘটে সিএসই-৩০ সূচকের। প্রধান সূচকটি সকালে ১৩ হাজার ৬৮৪ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করে দিনশেষে স্থির হয় ১৩ হাজার ৬৮৯ দশমিক ২৯ পয়েন্টে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা গতকালের বাজার আচরণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, গত কয়েকদিনের টানা দরপতনে বাজারের মূল্যস্তর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। ফলে বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিও কিছটা হ্রাস পেয়েছে। তাই সক্ষম বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নতুন করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সকালে বাজারগুলোতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তারা মনে করেন, বড় ধরনের চাপের মুখে না পড়লে সামনে কয়দিন ভালো যেতে পারে।
এ দিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক আর্থিক কার্যক্রম, ব্যবসার ধরন ও শরিয়াহ সম্মততার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) তাদের শরিয়াহ সূচকে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবার সূচকে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন কোম্পানি, আর বাদ পড়েছে আগের ১০টি প্রতিষ্ঠান।
গত রোববার সিএসইর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ৩৮৪টি কোম্পানির মধ্যে মূল্যায়নের পর শরিয়াহ সূচকে বর্তমানে অন্তর্ভুক্ত হবে মোট ১১২টি প্রতিষ্ঠান। নতুন সূচক তালিকা আগামী ১৮ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
সিএসইর সর্বশেষ সমন্বয়ে শরিয়াহ সূচকে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ পিএলসি। কোম্পানিটির আর্থিক স্থিতি ও ব্যবসার ধরন শরিয়াহ নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় এটিকে শরিয়াহ সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্য দিকে নিয়মিত মূল্যায়নে শরিয়াহ মানদণ্ড পূরণ করতে না পারায় সূচক থেকে বাদ পড়েছে মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক লিমিটেড, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন লিমিটেড, ইয়াক্বীন পলিমার, মারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অফ বাংলাদেশ পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি। এদের মধ্যে ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংককে ইতোমধ্যে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়েছে। এর ফলে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর লেনদেন বন্ধ আছে।
সিএসই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শরিয়াহ সূচক পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য এবং ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামো বজায় রাখা। তাই কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ঋণ-অনুপাত, সুদভিত্তিক আয়-ব্যয়সহ বিভিন্ন সূচক নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সূচক সমন্বয় করা হয়।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৩ কোটি ২৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ছয় লাখ পাঁচ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় ৩৭ লাখ ৫৬ হাজর শেয়ার বেচাকেনা করে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ উঠে আসে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসই’র লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ডমিনেজ স্টিল রিল্ডিং সিস্টেমস, একমি পেস্টিসাইডস, বিডি থাই ফুড, মুন্নু ফেব্রিক্স, ফাইণ ফুডস ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম।
ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯১টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল ২৮৭টি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে খাদ্য ও আনুসঙ্গিক খাতের রহিমা ফুড করপোরেশন। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ইনটেক অনলাইন উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসই মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ইফরমেশন সিস্টেমস নেটওয়ার্ক, রহিম টেক্সটাইল, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচা অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, নিটল ইন্স্যুরেন্স, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স ও একমি পেস্টিসাইডস।
দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এফএএস ফিন্যান্স। গতকাল ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের ফ্যামিলিটেক্স। ডিএসই’র দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম. নিউলাইন টেক্সটাইলস, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, তাল্লু স্পিনিং ও পিপল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।



