বিপিএলের ক্ষতে ডিপিএলের প্রলেপ

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

আর্থিক অনিয়মের ছুঁতো, নানা অজুহাত, নানা ছক আর নানা পরিকল্পনার ভিড়ে শেষ পর্যন্ত হচ্ছে না বিপিএল! বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ঘরোয়া আসরটি যখন হওয়ার কথা, তখন মাঠে ক্রিকেট নেই; আছে শুধু সিদ্ধান্তহীনতা, টালবাহানা আর দায়িত্ব এড়ানোর পুরনো সংস্কৃতি। অথচ এই বিপিএলই যে কত ক্রিকেটারের রুটি-রুজির অবলম্বন, সে হিসাবটি যেন কারো মাথায়ই নেই।

যারা এক দিন ক্রিকেটারদের স্বার্থের কথা বলে সোচ্চার হয়েছেন, প্রকাশ্যে এসেছেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদের অনেকেরই কণ্ঠ এখন স্তব্ধ। ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ, তাদের আয়-রোজগার, ঘরোয়া ক্রিকেটের ধারাবাহিকতা- সব কিছু নিয়ে যারা বুক চাপড়ে কথা বলেছেন, আজ তাদের হাতেই যেন বিপিএল বন্ধের চাবি! কী নির্মম পরিহাস!

বিপিএল বন্ধ। কিন্তু ক্রিকেট তো থেমে থাকতে পারে না। সেই সুযোগটিই এবার নিতে চাইছে সিসিডিএম। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগকে জাঁকজমকপূর্ণ করে আয়োজনের পরিকল্পনা হচ্ছে। যেন বিপিএলের শূন্যতা একটু আড়াল করা যায়, ক্রিকেটারদের মুখে কিছুটা হাসি ফেরানো যায়, আর ক্রিকেটপ্রেমীদেরও বোঝানো যায়- ‘দেখুন, খেলা তো হচ্ছে!’

হ্যাঁ, ডিপিএল হোক; বরং আরো বড় পরিসরে হোক। ক্রিকেটাররা খেলুক, আয় করুক, নিজেদের প্রস্তুত রাখুক। কিন্তু ডিপিএল দিয়ে বিপিএলের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা করলে প্রশ্ন থেকেই যাবে- একটি আয়োজন বন্ধ করার দায় কি আরেকটি আয়োজন দিয়ে মুছে ফেলা যায়?

বিপিএল শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি অসংখ্য ক্রিকেটারের আয়ের পথ, নিজেদের প্রমাণের মঞ্চ এবং জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ার অন্যতম সিঁড়ি। সেই মঞ্চ বন্ধ করে দিয়ে পরে ডিপিএলের জৌলুস দেখানোটা অনেকটা আগুন লাগিয়ে তার পর ফুলের তোড়া নিয়ে হাজির হওয়ার মতো। তবু ডিপিএল যদি হয়, জাঁকজমকেই হোক। মাঠে ফিরুক ক্রিকেটারদের ব্যস্ততা, ফিরুক তাদের রুটি-রুজি। তবে এটাও মনে রাখা দরকার- ক্রিকেটারদের স্বার্থের কথা মুখে বললেই হয় না, তাদের জন্য মাঠও রাখতে হয়।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এবার নেই! আর সেই শূন্য জায়গাটাকেই যেন নিজেদের সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে ঢাকা ক্রিকেট। ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরনো ও মর্যাদার আসর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগকে (ডিপিএল) এবার শুধু আরেকটি মৌসুম হিসেবে নয়, দেশের ক্রিকেটের বড় মঞ্চ হিসেবে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস (সিসিডিএম)। পরিকল্পনাটা শুধু সূচি এগিয়ে আনা কিংবা জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিপিএলে আবার বিদেশী ক্রিকেটারদের ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সাথে আম্পায়ারিং নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক কমাতে সুপার লিগে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার হতে পারে কম খরচের ‘অ্যাফোর্ডেবল ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম’-এডিআরএস। আর সেই ব্যবস্থার পেছনে থাকতে পারে ড্রোন ক্যামেরা।

আগামী বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলার কথা ডিপিএল। ৬৭ দিনের এই সময়টায় বাংলাদেশ জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ব্যস্ততা না থাকায় দেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদের প্রায় সবাইকে ডিপিএলে পাওয়ার আশা করছে সিসিডিএম। ফলে বিপিএল না থাকলেও জাতীয় দলের তারকাদের নিয়ে দীর্ঘ একটি ঘরোয়া ক্রিকেট উৎসব তৈরি করার সুযোগ দেখছে তারা। আর সেই উৎসবকে আরো আকর্ষণীয় করতে ফিরছে বিদেশী ক্রিকেটার। একসময় ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে বিদেশী তারকার উপস্থিতিই ছিল আলাদা আকর্ষণ। আশির দশক থেকে এই লিগে খেলেছেন রমন লাম্বা, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সনাথ জয়াসুরিয়া, ওয়াসিম আকরাম, শহীদ আফ্রিদি, স্টিভ টিকোলো কিংবা দিনেশ কার্তিকের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা। ঢাকার মাঠে তাদের উপস্থিতি শুধু ম্যাচের মান বাড়াত না, ক্লাব ক্রিকেটের চার পাশে তৈরি করত অন্যরকম উন্মাদনাও।

কিন্তু সময়ের সাথে সেই জৌলুস অনেকটাই হারিয়েছে। গত তিন মৌসুমে ডিপিএলে বিদেশী ক্রিকেটার দেখা যায়নি। মূল কারণ ছিল ক্লাবগুলোর আর্থিক বাস্তবতা; ২০২৪ সালের আসরেও অধিকাংশ ক্লাব বিদেশী ক্রিকেটারের খরচ বহন করতে আগ্রহী ছিল না। এবার সেই দরজা আবার খুলতে চাইছে সিসিডিএম! পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি ক্লাব একজন করে বিদেশী ক্রিকেটার খেলাতে পারবে। সিসিডিএম চেয়ারম্যান ও বিসিবি পরিচালক মঈন উদ্দিন চৌধুরী জানালেন, বিদেশী খেলোয়াড় ফেরানোর লক্ষ্য ডিপিএলকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা। সাম্প্রতিক আলোচনায় ১২টি দল একজন করে বিদেশী ক্রিকেটার নিলে প্রতিটি দলই বাড়তি মানসম্পন্ন একজন ক্রিকেটার পাওয়ার সুযোগ পাবে বলে ভাবা হচ্ছে।

ডিপিএলে আম্পায়ারিং নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। নির্দিষ্ট দলের প্রতি আম্পায়ারের পক্ষপাতের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। ম্যাচগুলো ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচার হওয়ার কারণে বিতর্কিত সিদ্ধান্তও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। সেই জায়গায় এবার প্রযুক্তির সাহায্য নিতে চাইছে সিসিডিএম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যবহৃত পূর্ণাঙ্গ ডিআরএস অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই সুপার লিগের ম্যাচগুলোতে তুলনামূলক কম খরচের এডিআরএস চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর সেই ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হতে পারে ড্রোন ক্যামেরা। লক্ষ্য একটাই- মাঠের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হলে অন্তত সীমিত পরিসরে হলেও পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করা। কোনো ক্লাব নির্দিষ্ট আম্পায়ার নিয়ে আপত্তি তুললে তাকে পরিবর্তনের সুযোগ রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে। এমনকি আম্পায়ারদের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট চালুর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

ডিপিএলকে এবার শুধু ক্রিকেট ম্যাচের সিরিজ হিসেবে দেখছে না সিসিডিএম। বিপিএল না থাকায় ঘরোয়া ক্রিকেটের মনোযোগটা যে এই প্রতিযোগিতার দিকে আরো বেশি থাকবে, সেটি কাজে লাগিয়ে লিগের পুরনো আকর্ষণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। একসময় বিদেশী তারকারা ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটকে আলাদা পরিচয় দিয়েছিলেন। এবার সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। পার্থক্য শুধু এতটুকু- সেই পুরনো তারকাখচিত ডিপিএলের সাথে এবার যুক্ত হচ্ছে ড্রোন ক্যামেরা, রিভিউ প্রযুক্তি এবং আম্পায়ারিংয়ে বাড়তি নজরদারি। বিপিএল নেই; কিন্তু ক্রিকেট নেই, এমনটি হতে দিতে চাইছে না ঢাকা; বরং দেশের সবচেয়ে পরিচিত ঘরোয়া ওয়ানডে আসরটিকেই এবার বানাতে চায় ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দু! খেলোয়াড়দের আশ্রয়স্থল, ভক্তদের চোখের প্রশান্তি।