নিজস্ব প্রতিবেদক
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যাতে আর কোনো ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে শ্রমিক পাঠাতে না হয় সেই দাবিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) একাংশের নেতৃত্বে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছিল। ওই সংবাদ সম্মেলনে কিছু সদস্যের প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে বায়রার সদস্যদের দু’টি পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি ও একপর্যায়ে পরিকল্পিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এতে প্রতিপক্ষের হামলায় সিন্ডিকেটের বিরোধিতাকারীদের অন্যতম বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মো: ফখরুল ইসলামসহ তার দলের আরো বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর পেয়ে শাহবাগ থানার পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। তবে এই ঘটনায় হামলা-পাল্টাহামলার অভিযোগে থানায় কোনো মামলা হয়েছে কি না তা গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি।
এ দিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যেসব মালিক শুরু থেকেই কোনোভাবেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠাতে রাজি নন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করে বলছেন, সিন্ডিকেটবিরোধী মালিকদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলার নির্দেশনা আসে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে। আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসরদের নির্দেশনা পেয়েই তাদের হয়ে ঢাকায় সিন্ডিকেট করতে ব্যস্ত চিহ্নিত দোসররা হামলা চালিয়ে সংবাদ সম্মেলন বানচাল করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করছেন তারা।
জানা যায়, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার একটি অংশ। সেখানে আরেক গ্রুপের পক্ষ থেকে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরপর তা ছড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে দুই পক্ষ মারামারিতে লিপ্ত হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফরকালীন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় উত্থাপিত আগের ন্যায় সিন্ডিকেটের পরিবর্তে সব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো এবং আসন্ন ২১ মে ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের হতে যাওয়া বৈঠকে সেটি বাস্তবায়নের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বায়রার একাংশ। এই একাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন বায়রার সাবেক সহসভাপতি রিয়াজ উল ইসলাম এবং সাবেক যুগ্ম মহাসচিব-১ মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও সিনিয়র সদস্য খন্দকার আবু আশফাক।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার পূর্বে বায়রার কিছু সদস্য এসে হট্টগোলের চেষ্টা করে। সেখানে এক পর্যায়ে ব্যাপক হইচই ও উত্তেজনা শুরু হয়। এক পর্যায়ে ফখরুল ইসলামের সাথে তারা বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এ সময় একদল সদস্য তাকে জাপটে ধরে নিচে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং কিল ঘুষি মারতে থাকেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সংলগ্ন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেও তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
সংবাদ সম্মেলন ডাকাদের একজন বায়রার সিনিয়র সদস্য রিয়াজ উল ইসলাম এই প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের একটা সুন্দর আয়োজনে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে গেল। আমরা এখানে সংবাদ সম্মেলন করতে এসেছিলাম। কিন্তু আমাদের এখানে তা করতে দেয়া হলো না। ফখরুলকে আমাদের কাছ থেকে তারা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ডিআরইউয়ের অ্যাডমিন অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে। আমরা কোনোভাবে বেঁচে গেছি। আমাদের চার-পাঁচজন সদস্য রক্তাক্ত হয়েছে। থানা থেকে পুলিশ আসছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। ফখরুল এখনো অবরুদ্ধ। পুলিশ তাকে উদ্ধার করতে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, পুলিশের উপস্থিতিতে আবারো দুই পক্ষ হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
এ দিকে বায়রার দু’ পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা শুরু করেন। অভিযুক্ত পক্ষে বায়রার সদস্য আতিকুর রহমান ও সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আমরা এখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে এসেছি। হল রুমে প্রবেশ করতে আমাদেরকে বাধা দেয়া হয়। যিনি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কেউ ঢুকতে পারবেন না। আমাদের বলা হলো, যিনি আহ্বান করেছেন ফখরুল সাহেব এলে আমরা এক সাথে প্রবেশ করব। কিন্তু তিনি আসার পর ৩-৪ জনকে প্রবেশ করার জন্য বলেন, বাকিদের ঢুকতে না করে দেন। কারণ সেখানে জায়গা কম, বেশি লোক জায়গা দেয়া যাবে না। এটা নিয়ে সাধারণ সদস্যরা জানতে চান, তিন-চার জনকে জায়গা দিলে সবাইকে দাওয়াত দিয়েছেন কেন? এটা নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এরপর উত্তেজনা, ধাক্কাধাক্কি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। তাদের দাবি, ফখরুল ইসলাম যখন বলেন, আজ সংবাদ সম্মেলন করবেন না তখন সাধারণ সদস্যরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল সাংবাদিকদের জানান, জনশক্তি রফতানিকারকদের দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় ডিআরইউয়ের বেশ কিছু ক্ষতি হয়েছে। চারতলা এবং নিচে ভাঙচুর করা হয়েছে। আমাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ আছে। পুলিশ এসেছে, আমরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সিন্ডিকেটকে সরাসরি না বলতে হবে। যেমনটি সম্প্রতি নেপালের মন্ত্রী স্পষ্টভাবে সিন্ডিকেটকে না বলেছেন। ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে পূর্বের সমঝোতা স্মারকের ন্যায় এমওইউ এর পৃষ্ঠা ২৮ এর ‘সি’ এর ৫ এবং ৬ ধারা বাদ দিতে হবে অথবা পরিবর্তন করতে হবে। যাতে অন্যান্য ১৪টি সোর্স কান্ট্রি দেশের ন্যায় মালয়েশিয়ান সরকারের পরিবর্তে মালয়েশিয়ান নিয়োগকর্তা বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি পছন্দ করতে পারে। এ ছাড়া সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে তাদের শাস্তি দেয়ার দাবি জানানো হয়।
গতকাল হামলার শিকার একজন মালিক নয়া দিগন্তকে নাম না বলার শর্তে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যারা আবারো সিন্ডিকেট করতে চাচ্ছেন সেই হোতাদের বেশির ভাগ পালিয়ে এখন দুবাই অবস্থান করছেন। কেউ কেউ রয়েছেন মালয়েশিয়াতে এবং পাশের দেশ সিঙ্গাপুরে। তাদের দেয়া পরিকল্পনাতে আজকের সংবাদ সম্মেলনে হামলা করার নির্দেশনা আসে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরো বলেন, যারা সিন্ডিকেট করতে চাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের চিহ্নিত দোসর, লুটেরা এবং টাকা পাচারকারী।
একই দিন বিকেলে বায়রার অপর অংশের পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, তারা চান মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি দ্রুত খুলে যাক। যাতে তারা দেশটিতে কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। তবে তারা শ্রমবাজারে সিন্ডিকেটের পক্ষে না বিপক্ষে সেই ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তারা শুধু বলেছেন, তারা জনশক্তি ব্যবসায়ী। দুই দেশের সরকার যেভাবে চাইবে তারা সেভাবে দেশটিতে শ্রমিক পাঠাবেন।



