গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
সন্ধ্যায় বসেছিল একটি সামাজিক সালিস। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে দুই পক্ষের ভুলবোঝাবুঝি মিটিয়ে হাত মেলানোর চেষ্টাও হয়েছিল; কিন্তু সেই সালিসের কয়েক ঘণ্টা পরই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। সংখ্যালঘু পরিবারের এক সদস্যের অভিযোগে দায়ের হয় হামলা, ভাঙচুর, কুপিয়ে আহত ও লুটপাটের গুরুতর মামলা। গ্রেফতার হন টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতীদলের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন খোকন, তার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একমাত্র ছেলে আশরাফুল ইসলাম অন্তর এবং আরেক ব্যক্তি।
ঘটনার পর দাড়াইল পশ্চিমপাড়ায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মামলার অভিযোগ নয়; বরং বাবা-ছেলের কারাবাস। যাদের একসময় মসজিদ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দেখা যেত, তাদেরই এখন কারাগারে দেখতে হচ্ছে- এ বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না বলে জানান অনেক বাসিন্দা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ুয়া অন্তরকে নিয়ে স্থানীয়দের আবেগ আরো বেশি। উত্তরার শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটির এই শিক্ষার্থীকে এলাকার তরুণদের কাছে শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী হিসেবে বর্ণনা করেন প্রায় সবাই। তার বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ না থাকলেও একটি বিরোধের মামলায় বাবার সাথে তাকেও কারাগারে যেতে হয়েছে। এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে এলাকাবাসীকে।
মামলার এজাহারে বাদি নীর মোহন অভিযোগ করেন, জমিজমা-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে গত ৬ জুলাই সন্ধ্যায় মনোয়ার হোসেন খোকন ও তার সহযোগীরা গ্রাইন্ডিং মেশিন দিয়ে গেট কেটে বাড়িতে ঢুকে তাকে কুপিয়ে আহত করেন এবং নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যান।
কিন্তু অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দা, সালিসে উপস্থিত ব্যক্তিরা ও খোকনের পরিবারের কাছ থেকে ঘটনার ভিন্ন বিবরণ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরো ঘটনার সূত্রপাত জমি নয়; বরং একটি ফাঁস হওয়া মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডকে কেন্দ্র করে। ওই রেকর্ডে নীর মোহন অতীতে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে খোকনের অবস্থান জানিয়ে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর উভয় পক্ষকে নিয়ে সালিস বসে।
সালিসে উপস্থিত কয়েকজন জানান, আপসের পর খোকন ব্যক্তিগতভাবে নীর মোহনের সাথে কথা বলতে চাইলে দু’জনের মধ্যে হঠাৎ উত্তেজনা তৈরি হয়। তাদের দাবি, একপর্যায়ে নীর মোহন খোকনের গলা চেপে ধরেন। উপস্থিত ব্যক্তিরা তাদের আলাদা করে দেন। পরে কিছু উত্তেজিত যুবক খোকনের পিছু নিলে তিনি নিজের বাড়িতে ঢুকে আশ্রয় নেন। এ সময় বাড়ির গেট ও দরজায় আঘাতের ঘটনা ঘটলেও ঘরের ভেতরে প্রবেশ বা এজাহারে বর্ণিত ধরনের হামলা ও বাদি নীর মোহনকে কোপানোর মতো ঘটনা তারা দেখেননি বলে দাবি করেন। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মাহবুব মাস্টার বলেন, ‘ঘটনার রাতে নীর মোহনকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখেছি। তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। পরদিন সকালে দেখি মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা।’
এজাহারে ২০১২ সাল থেকে জমি নিয়ে বিরোধ এবং আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকার কথা উল্লেখ করা হলেও সরেজমিন স্থানীয়ভাবে তার সমর্থনে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাদির চাচা সীতানাথ মণ্ডলের সাথেও কথা বলে এমন বিরোধের সত্যতা মেলেনি বলে স্থানীয়রা জানান।
তবে বাদি নীর মোহন এসব বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সালিসে মীমাংসার পর খোকন আমাকে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিই। পরে তারা বাড়িতে এসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। খবর দিলে পুলিশ এসে আমাকে রক্ষা করে।
কথা হয় দাড়াইলের স্থায়ী বাসিন্দা আকবর আলীর সাথে। তিনি বলেন, খোকনের ছেলে অত্যন্ত ভালো ছেলে। গ্রামের ছেলে-মেয়েদের কাছে সে আদর্শ। কোনো ঝামেলায় তাকে কখনো দেখিনি। আলোচিত ঘটনাতেও তার সম্পৃক্ততার কথা আমরা জানি না। অথচ তাকেও গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সুন্দর আলী বলেন, ‘খোকন দীর্ঘদিন ধরে মসজিদ কমিটির সভাপতি। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ান। এলাকায় তার বিরুদ্ধে আগে কোনো অভিযোগ শুনিনি। তাই ঘটনাটা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।’
খোকনের স্ত্রী আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীকে দলীয় কোন্দলের জেরে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকেও ছাড় দেয়া হয়নি। একটি পরিবারের সব স্বপ্ন যেন এক মুহূর্তে থেমে গেছে।’
গাজীপুর মহানগর তাঁতীদলের সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়ায় সাংগঠনিক ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে তাকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হবে।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি বলেন, খোকনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে আমরাও অবগত। প্রাথমিকভাবে এটি একটি ভুলবোঝাবুঝি থেকে সৃষ্ট বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে জানা গেছে, সাম্প্রদায়িক কোনো বিষয় নয়। তবে তদন্তে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দাড়াইল পশ্চিমপাড়ায় এখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে একটি প্রশ্ন, সামাজিক সালিসের পর সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা কি সত্যিই এজাহারে বর্ণিত ভয়াবহ অপরাধে রূপ নিয়েছিল, নাকি পরবর্তী সময়ে আরো জটিল ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা পেয়েছে? তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই এর চূড়ান্ত উত্তর দেবে। তবে এর আগেই বাবা-ছেলের কারাবাস গ্রামজুড়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।



