- সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি
- নতুন সামরিক কমান্ডের অধীনে প্রাণঘাতী বিমান হামলার পরিকল্পনা
- ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ১০৮ কিলোমিটার সীমান্ত বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ বাংলাদেশের
মিয়ানমারের সামরিক কমান্ডে রদবদলের পর দেশটির সঙ্ঘাতকবলিত অঞ্চলগুলোতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর দমন-পীড়ন আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন বলছে, চলতি বছরের মার্চে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব ছেড়ে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসার পর মিন অং হ্লাইং সামরিক নেতৃত্ব হস্তান্তর করেন নতুন কমান্ডের কাছে। এর পর থেকেই অভিযানিক কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। বিমান হামলার সংখ্যা কমলেও প্রতিটি হামলা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে, যার সরাসরি শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। একই সাথে মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সঙ্ঘাত তীব্র হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। যাতে অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায় এবং জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণœ থাকে। অপর দিকে লাগাতার পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্তে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে বিএসএফ সদস্যরা পুশইনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এ দিকে ভারতে চলমান সঙ্ঘাত-সহিংসতার মধ্যেও ব্যাপকভাবে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অমানবকিভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে। বিজিবির হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে পুশইনের চেষ্টা প্রতিরোধ করা হয়েছে। বিজিবি সূত্র জানায়, পুশইন ঠেকাতে বিজিবি সদর দফতর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সীমান্ত এলাকায় মাঠ পর্যায়ের বিজিবি সদস্যদের মনিটরিং করছেন। তাদের দাবি- কোনো অবস্থাতেই পুশইন করতে দেয়া হবে না।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, প্রায় ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-মিয়ানমার দখলে নেয়ার পর বুথিডং এলাকাও আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে আরাকানদের সাথে জান্তা সরকারের চিন, কারেন (কায়িন), রাখাইন, পূর্বাঞ্চলীয় বাগো, মাগওয়ে ও সাগাইং- এই ছয় অঞ্চলে সামরিক বিমান, ড্রোন ও দূরপাল্লার অস্ত্র দিয়ে হামলা অব্যাহত রয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্কুল, হাসপাতাল, উপাসনালয়, বিয়ের অনুষ্ঠান এমনকি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রও এখন সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু।
রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের প্রচলিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে : গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মাগওয়ে, মান্দালে ও সাগাইংয়ের একাংশ নিয়ে গঠিত ‘আনিয়ার’ অঞ্চলে সামরিক বাহিনী তথাকথিত ‘পোড়ামাটি নীতি’ বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা চালিয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধেই এসব এলাকায় শত শত বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে। শহরাঞ্চলেও নিপীড়নের ধরন পাল্টেছে- ব্যক্তি যাচাই ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা (পিএসএমএস) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত নজরদারি ক্যামেরা, জাতীয় পরিচয় ডেটাবেস ও বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার-বিরোধী সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত ও আটক করছে সামরিক কর্তৃপক্ষ।
সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে বাংলাদেশ : মিয়ানমার পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সীমান্তে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সঙ্ঘাত তীব্রতর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। যাতে অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায় এবং জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণœ থাকে।
সরকারি সূত্র বলছে, প্রায় ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছে বিজিবি সদর দফতর।
বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় মিয়ানমার সরকারের প্রচলিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে, ফলে সীমান্তে নজরদারি নিশ্চিত করা আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। রাখাইনে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, জেলে অপহরণ এবং মাদক-অস্ত্র পাচারের ঘটনাও সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত : নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশকে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এক দিকে নতুন শরণার্থী স্রোত ঠেকানো, অন্য দিকে সীমান্তপথে অস্ত্র, মাদক পাচার ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ। কক্সবাজারের বিদ্যমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ইতোমধ্যে জনসংখ্যার চাপ ও মানবিক সঙ্কট প্রকট, নতুন করে অনুপ্রবেশ হলে তা আরো বাড়বে।
ভারতের পুশইনের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশ নিয়ে বড় ধরনের কোনো সমস্যা তৈরি না করতে পারলেও সীমান্তে উত্তজনা বাড়াতে পুশইনের মতো ঘটনা ঘটানো হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব:) আশরাফুজ্জামান মনে করেন, মিয়ানমার সঙ্কট এখন কেবল প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়- এটি সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সীমান্ত অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিজিবি সদর দফতর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে গতকাল পর্যন্ত বিএসএফ কর্তৃক পুশইন করা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ জনকে। এর মধ্যে বিজিবি ২ হাজার ৩৬৬ জন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাতজন, পুলিশ ৫১ জন ও কোস্ট গার্ড ৭৮ জনকে আটক করে তাদের ভারতে ফিরিয়ে দিয়েছে।
তার মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৪৯২ জন এবং বিধান সভা নিার্বাচনের পরে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ।
বিজিবি সূত্র জানায়, আটককৃতদের জাতীয়তা ও পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পর ২ হাজার ১৩২ জন বাংলাদেশী, ভারতীয় ১০ জনের নিবন্ধনকৃত এফডিএমএন ১৩৯ জনসহ ২২৮১ জনকে আইননানুগ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়। বাকি ২২১ জনের মধ্যে ১১৩ জন ভারতীয় এবং ৫৭ জন এফডিএমএন নাগরিককে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। এ ছাড়াও ২১ জন ভারতীয় নাগরিককে বিএসএফের কাছে এবং ৩০ জন এফডিএমএনকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিজিবি সূত্র আরো জানায়, পুশইন প্রতিরোধ সংক্রান্ত মোট ঘটনা ১৩৩টি। তাদের মধ্যে এক হাজারের বেশি ভারত থেকে পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ করেছে বিজিবি।
এ বিষয়ে বিজিবি সদর দফতরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আব্দুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম নয়া দিগন্তকে বলেন, পাঁচ মাসে বিজিবি দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে মিয়ানমার সীমান্তে ১০৮ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ শিগগিরই শুরু হবে। ভারত থেকে পুশইন ঠেকাতে এবং মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে যেন নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেক্ষেত্রে বিজিবি সদর দফতর থেকে ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বর্ডারে নিয়মিত মনিটরিং করছেন। পুশইনের বিষয়ে জিরো টলারেন্স- এমনটাই নির্দেশ দেয়া হয়েছে ব্যাটালিয়নের সিও থেকে সৈনিক পর্যন্ত।



