নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং আন্দোলনের ইতিহাস দলিলভিত্তিকভাবে সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত ‘জুলাই জাগরণ ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এর বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে জনগণ আবারো প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা তা চাই না, কারণ আপনারাও মজলুম ছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘জুলাই জাগরণ ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দুই বছর আগে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে। শিশু থেকে তরুণ সবাইকে এই ইতিহাস জানতে হবে। প্রতীকী কবর ও স্মৃতি প্রদর্শনী ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আয়োজন মানুষের কাছে আন্দোলনের আত্মত্যাগকে আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে। তিনি আরো বলেন, ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া তরুণরাই ভবিষ্যতে দেশ গঠনে নেতৃত্ব দেবে। বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে তাদের জন্য দোয়া করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কোনো স্বৈরাচার বা দমনমূলক শাসন মেনে নেয় না। জুলাই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশায়। সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা এবং ছাত্রশিবিরের ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিকে আরো মর্যাদাপূর্ণ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কেউ যদি নতুন করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে জনগণ অতীতের মতোই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আহত ও শহীদ পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে সরকারকে অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম। সভাপতির বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে এবং বিভিন্ন স্থানে ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিতে ছাত্রদলের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সরকারকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছি। তার পরেও আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছি। যদি প্রতিশোধ নিতে হয়, কোনো অপশক্তি তা ঠেকাতে পারবে না।
অনুষ্ঠানে ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। প্রথম স্থান অর্জন করে মাহমুদ এইচ এম (নোয়াখালী) নির্মিত ‘গ্রামের চোখে জুলাই’। তিনি পুরস্কার হিসেবে দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ লাভ করেন। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ‘জুলাইয়ের ছিটেফোঁটা’ (গাজীপুর মহানগর), যার পুরস্কার এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। তৃতীয় স্থান লাভ করে ‘দ্রোহের জুলাই’ (নরসিংদী জেলা শাখা), পুরস্কার এক লাখ টাকা। চতুর্থ স্থান অধিকার করে ‘বুলেটের বৃষ্টি পেরিয়ে’ (ঢাকা মহানগর পূর্ব), পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা। পঞ্চম স্থান অর্জন করে ‘ঞযব ঝরষবহঃ ঊপযড়’, যার পুরস্কার ৩০ হাজার টাকা।
এ সময় অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
শুভেচ্ছাবাণীতে ডা: শফিক : শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল- একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ইনসাফভিত্তিক এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। তারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ জাতিকে এক মহৎ ঋণে আবদ্ধ করে গেছেন। আমরা তাদের কাছে চিরঋণী। তিনি আরো বলেন, অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, একটি মহলের কারণে আমরা তাদের সেই প্রত্যাশা আজও পূরণ করতে পারিনি। এখনো আমাদের লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। জাতিকে যেকোনো মূল্যে তাদের এই রক্তঋণ পরিশোধ করতে হবে। আমাদের শপথ নিতে হবে- শহীদদের এই রক্ত যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়। বীর শহীদদের রক্তের ঋণ আমরা কেবল তখনই আংশিক পরিশোধ করতে পারব, যখন একটি বৈষম্যহীন, পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ইনসাফপূর্ণ মানবিক বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হবো।
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে গতকাল এক শুভেচ্ছাবাণীতে বিরোধীদলীয় নেতা এ কথা বলেন। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট- ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আমি দেশবাসী ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত সব বাংলাদেশী ভাই-বোনদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, এই আন্দোলনে জাতিকে চরম ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং রক্তমূল্য দিতে হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির একাংশের মাধ্যমে নির্বিচারে চালানো গুলিতে প্রায় দেড় হাজার মুক্তিকামী মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। কয়েক হাজার মানুষ তাদের হাত, পা বা চোখ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। শহীদ আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ওয়াসিমসহ যেসব তাজা প্রাণ বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়ে শাহাদতবরণ করেছেন, আমি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে তাদের স্মরণ করছি এবং তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। একই সাথে আন্দোলনের সময় আহত, পঙ্গুত্ব বরণকারী, শহীদ পরিবার এবং নির্যাতিত সবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন : রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই ভুলিয়ে দেয়ার জন্য আমাদেরকে অনেক প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। আমাদের সোজাসাপটা কথা- জুলাই ভুলিয়ে দেয়ার সব অপচেষ্টা তছনছ করে দেয়া হবে। জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটাই মানতে হবে। তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না। কেউ করলে আমরা তা মানব না।
ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের উপদেষ্টা বুয়েটের অধ্যাপক ড. ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন- জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ডাকসুর ভিসি সাদিক কায়েম, বীরমুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান রঞ্জন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।



