সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত

অধ্যাদেশ ল্যাপস করে সংস্কারের আকাক্সক্ষা ধূলিসাৎ করা হয়েছে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ ল্যাপস (বাতিল) করার মাধ্যমে জনগণের সংস্কারের আকাক্সক্ষাকে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল রাজধানীর মগবাজারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির পক্ষ থেকে এই অভিযোগ তোলা হয়। সরকারের আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কামাল হোসাইন এমপি, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, ব্যারিস্টার মাহবুব সালেহী, জাহিদুর রহমান, মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান এবং সিনিয়র সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান।

ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, সংস্কারের অংশ হিসেবে জারিকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের ওপর গঠিত বিশেষ কমিটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গত ১০ এপ্রিল এসব অধ্যাদেশ পাসের সময়সীমা পার হয়ে যায়। এর মধ্যে ১১০টি পাস হলেও ৭টি রহিত এবং ১৬টি অধ্যাদেশ ল্যাপস করা হয়েছে। ল্যাপস হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশনের মতো সংবেদনশীল ও সংস্কারমুখী বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, বিশেষ কমিটিতে যে বিষয়গুলোতে সহমত হয়েছিল, সরকার পক্ষ সংসদে তা লঙ্ঘন করেছে। যেসব বিলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়া হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ না দিয়েই পাস করা হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত অধ্যাদেশের রিপোর্টে বিরোধীদলীয় সদস্যদের বক্তব্য এবং আপত্তির বিষয়গুলো কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে ‘সত্যের অপলাপ’ করা হয়েছে।

সংসদ সদস্য মোমেন আরো জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিলেও এক মাস পর অধিবেশন ডেকে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করেছে, যাতে বিলগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ না থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিল পাসের মাত্র ১০-১৫ মিনিট আগে সংসদ সদস্যদের হাতে কাগজপত্র দেয়া হয়েছে।

বিশেষ করে ‘ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংক ডাকাতদের অর্থ ফেরত না নিয়ে কেবল একটি অঙ্গীকারনামার বিনিময়ে সুযোগ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ‘জুলাই জাদুঘর বিলে’ মন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, যেখানে নোট অব ডিসেন্ট দেয়ারও সুযোগ রাখা হয়নি। এসব অনিয়মের প্রতিবাদেই বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।

সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট শিশির মনির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের আইনি ত্রুটিগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গুম অধ্যাদেশ বাতিলের সপক্ষে সরকারের দাবি- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও গুম অধ্যাদেশের সংজ্ঞা একই- এটি সম্পূর্ণ ভুল। এটি আইনগতভাবে সঠিক নয়। মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের খোলা চিঠির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, গুম অধ্যাদেশের ২৮ ধারায় পদ্ধতিগত গুমের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল, যা ল্যাপস করার মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর তোলা তদন্ত সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনের ১৬ ও ২৮ ধারায় ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা এবং জরিমানার বিধান স্পষ্ট ছিল। অথচ মন্ত্রী দাবি করছেন আইনে এসব নেই।

২৮ জন বিচারককে শোকজ করার সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, যে আইনে বিচারকদের শোকজ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট আগেই সেই আইনটিকে অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করেছে। সরকার ও আইন মন্ত্রণালয় আইন বাতিলের খবর পর্যন্ত রাখে না, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অর্থ শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা নয়, বরং বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকতে হবে এবং এর জন্য পৃথক সচিবালয় অপরিহার্য।

সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত আইনগুলো অকার্যকর করার ফলে বর্তমানে কেউ গুম হলে প্রতিকার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। ব্যারিস্টার মোমেন বলেন, রাষ্ট্র মেরামতের জন্য জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। যদি জনগণ সংসদের ওপর আস্থা হারিয়ে অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে আসে, তবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার সরকার ও সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নিতে হবে।

নেতৃবৃন্দ সরকারকে বিভ্রান্তিকর আইনি ব্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত থাকার এবং জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান।