কর্ণফুলী টানেলের অতিথিশালার ইজারা দরপত্রের মূল্যায়ন চলছে

দিনে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৩৮ থেকে নেমে ২৩ লাখে

Printed Edition
কর্ণফুলী টানেলের প্রবেশপথ, ইনসেটে অতিথিশালার একাংশ  : নয়া দিগন্ত
কর্ণফুলী টানেলের প্রবেশপথ, ইনসেটে অতিথিশালার একাংশ : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

চীন ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত মাল্টিলেন রোড টানেলে ট্রাফিক ভলিউম (যানবাহন চলাচল) আশানুরূপ বৃদ্ধি না পাওয়ায় লোকসানের পরিমাণ পূর্বের তুলনায় কমলেও ক্ষতির অঙ্ক ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আগের তুলনায় বেশ কমলেও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

এদিকে কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে নির্মিত বিলাসবহুল অতিথিশালা ইজারা দেয়ার জন্য আহ্বান করা দরপত্রের মূল্যায়ন চলছে। চলতি মাসে বা আগামী মাসে এ প্রক্রিয়া শেষে ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী নয়া দিগন্তকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শুরুতে প্রতিদিন গড়ে ওই টানেলের রক্ষণাবেক্ষণে ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় হলেও বর্তমানে তা কমে গড়ে ২৩ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। শুরু থেকে গত ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই টানেলে যানবাহন চলাচল করেছে ৪০ লাখ ২২৬ হাজার ৩০৪টি। গড়ে প্রতিদিন যানবাহন চলাচল করেছে মাত্র তিন হাজার ৮৬৯টি।

সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী গোলাম সামদানি হিমেল জানান, গত দেড় বছর ধরে প্রতিদিন টানেলের রক্ষণাবেক্ষণে গড়ে ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। এর আগে প্রতিদিন খরচ হয়েছে ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ টাকা করে। তিনি জানান, ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানেল থেকে আয় হয়েছে মাত্র ১১৬ কোটি ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ টাকা। এখন গড়ে প্রতিদিন আয় হচ্ছে মাত্র ১১ লাখ ২৩ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হচ্ছে ২২ থেকে ২৩ লাখ টাকা।

৩ জুলাই নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত টানেল রক্ষণাবেক্ষণ এবং সাতটি ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেম সচল রাখতে গড়ে প্রতিদিন ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিপরীতে গড়ে প্রতিদিন টোল আদায় হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ৯৬ হাজার ৪২৬ টাকা।

প্রতিদিন ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা খরচ হিসাবে দুই বছরে ২৭৩ কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। অপর দিকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ৯৬ হাজার ৪২৬ টাকা করে দুই বছরে আয় হয়েছে মাত্র ৭৭ কোটি ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৩৫০ টাকা। গত দুই বছরে যানবাহন চলাচল করেছে ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৬৫৫টি। গড়ে প্রতিদিন যানবাহন চলাচল করেছে তিন হাজার ৮৬৪টি। সে হিসাবে প্রতিবছর লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা করে। দুই বছরে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯৬ কোটি টাকা।

জানা গেছে, ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ ৩৩ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল ২৯ অক্টোবর ২০২৩ থেকে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্প সহায়তা ছিল ছয় হাজার ৭৭ কোটি ৫৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। প্রকল্পে আনোয়ারা ও চট্টগ্রাম প্রান্তে ৩৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেতু ও সড়ক বিভাগ এবং চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড।

টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং দুই প্রান্তের তীরসহ এর দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার। নদীর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাশে সংযোগ সড়কসহ এ প্রকল্পের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার। প্রতিটি টিউবের ভেতরের অংশের প্রশস্ততা ১০ দশমিক ৮ মিটার করে। এ ছাড়া আনোয়ারা প্রান্তে ৭০০ মিটারের একটি উড়াল সড়ক বা ফ্লাইওভারসহ ৫ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এটি আনোয়ারার চাতুরী চৌমুহনীতে এসে চট্টগ্রাম-আনোয়ারা-বাঁশখালী পিএবি সড়কের সাথে মিলিত হয়েছে। অপর প্রান্তে সংযোগ সড়ক নগরীর পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি পয়েন্ট দিয়ে মূল সড়কের সাথে যুক্ত হয়েছে।

অতিথিশালা : ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আনোয়ারা প্রান্তে নির্মিত কর্ণফুলী টানেলের সাত তারকামানের অতিথিশালা ২৯ বছরের জন্য ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ কারণেই অতিথিশালা বা সার্ভিস এরিয়া ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বিলাসবহুল অতিথিশালা নির্মাণের তিন বছর পার হলেও তা চালু হয়নি। সাত তারকামানের ওই অতিথিশালা নির্মাণের পর থেকেই খালি পড়ে আছে। অতিথিশালা নির্মাণে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এতে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল নির্মাণের ব্যয়ও বেড়ে যায়।

এসব কারণেই মূলত ওই সার্ভিসিং এরিয়া বা অতিথিশালা ইজারা দেয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। গত ১১ জুলাই দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল বলে জানা গেলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত মাসে তা সম্পন্ন হয়। এখন ইজারা নেয়ার জন্য জমা দেয়া দরপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কাজ চলছে।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অতিথিশালায় রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুট আয়তনের আধুনিক ও সুসজ্জিত একটি বাংলো। এ ছাড়া রয়েছে ছয়টি কক্ষ। সামনেই রয়েছে সুইমিংপুল। অতিথিশালা ছাড়াও নির্মাণ করা হয়েছে আরো ৩০টি রেস্টহাউজ।

টানেল নির্মাণ প্রকল্পে যে জায়গায় অতিথিশালা নির্মাণ করা হয়েছে, সেটিকে বলা হয় ‘সার্ভিস এরিয়া’। প্রকল্পের শুরুতে ‘সার্ভিস এরিয়া’ ছিল না। মাঝপথে এটি যুক্ত করে প্রায় ৭২ একর জায়গাজুড়ে নানা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। সার্ভিস এরিয়াজুড়ে বাংলো ও রেস্টহাউজ ছাড়াও রয়েছে টানেলের একটি রেপ্লিকা, সম্মেলনকেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হেলিপ্যাড, মসজিদ, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন। আরো রয়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে একটি জাদুঘর। এসব স্থাপনায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বসানো হয়েছে এক হাজার ১৮২ টন ক্ষমতার।