আইনের ফাঁক গলে বড় করপোরেটদের হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ খাতেই গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ‘ফাঁকি নেটওয়ার্ক’ যেখানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের সূক্ষ্ম ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। জটিল হিসাব পদ্ধতি, ভুয়া চালান, আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের কারসাজি এবং কর কাঠামোর অস্পষ্টতা সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত পদ্ধতিতে ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, যা সাধারণ করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ খাতেই গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ‘ফাঁকি নেটওয়ার্ক’ যেখানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের সূক্ষ্ম ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব এড়িয়ে যাচ্ছে। জটিল হিসাব পদ্ধতি, ভুয়া চালান, আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের কারসাজি এবং কর কাঠামোর অস্পষ্টতা সব মিলিয়ে একটি সুসংগঠিত পদ্ধতিতে ভ্যাট ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, যা সাধারণ করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিগত দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতিই এই প্রবণতাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে, ফলে রাষ্ট্র হারাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এ খাতেই তৈরি হয়েছে বিশাল ফাঁক, যেখানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলী ব্যবস্থাপনায় সরকারের সম্ভাব্য রাজস্বের বড় অংশ অধরাই থেকে যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে ভ্যাট খাতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা হলেও অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে আদায় তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ভ্যাট গ্যাপ অর্থাৎ সম্ভাব্য আদায় ও প্রকৃত আদায়ের পার্থক্য এখনো বিপজ্জনকভাবে উচ্চতা রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, ভ্যাট খাতে সম্ভাব্য আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফাঁকি, ছাড় এবং দুর্বল প্রশাসনের কারণে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই ’২৫-মার্চ ’২৬) রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। এ ঘাটতি গত অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়েও পাঁচ হাজার ৩৬৪ কোটি বেশি। গত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। তবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়লেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল দুই লাখ ৫৮ হাজার ৯৯৬ কোটি। অথচ মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা।

সে হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। একক মাস হিসেবে মার্চে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের মার্চের চেয়ে গত মার্চে আদায় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। ৯ মাসে এ খাতে এক লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা; অর্থাৎ ঘাটতি ৪০ হাজার ৬১৭ কোটি। এ ছাড়া ভ্যাট বিভাগে এক লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৮ কোটির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে এক লাখ ৯ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এ খাতে আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি। অন্য দিকে কাস্টমস অনুবিভাগ এক লাখ তিন হাজার ১৯৬ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় করেছে মাত্র ৮০ হাজার ২২৩ টাকা।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, করপোরেট ভ্যাট ফাঁকি এখন আর সরাসরি আইন ভাঙার মাধ্যমে নয়, বরং আইনের ফাঁক ব্যবহার করে ‘ট্যাক্স এভয়ডেন্স’ বা কর পরিহারের মাধ্যমে বেশি হচ্ছে। বড় বড় কোম্পানির নিজস্ব ট্যাক্স বিশেষজ্ঞ দল থাকে, যারা আইনের সূক্ষ্ম দিকগুলো ব্যবহার করে বৈধতার মধ্যে থেকেই কর দায় কমিয়ে আনে। এই ফাঁকির অন্যতম পদ্ধতি হচ্ছে বিক্রয় আন্ডার-রিপোর্টিং। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রকৃত বিক্রির তুলনায় কম দেখায়, ফলে তাদের ভ্যাট দায় কমে যায়। এ ছাড়া ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট ব্যবস্থার অপব্যবহারও বেড়েছে। কাঁচামাল কেনার সময় বেশি ভ্যাট দেখিয়ে পরবর্তীতে সমন্বয়ের মাধ্যমে কর কমানো হচ্ছে, যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় করপোরেট গ্রুপগুলো একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজেদের মধ্যে লেনদেন দেখিয়ে একটি জটিল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে খরচ ও আয় এমনভাবে দেখানো হয়, যাতে করযোগ্য অংশ কমে যায়। ফলে কাগজে-কলমে সব কিছু বৈধ মনে হলেও প্রকৃত কর আদায় কমে যায়।

এ দিকে আমদানি-রফতানি খাতেও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার হচ্ছে। পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে ভ্যাট ও শুল্ক ফাঁকি দেয়া হচ্ছে, যা ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিংয়ের সাথে যুক্ত। পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মুনাফা কম দেখিয়ে বিদেশে স্থানান্তর করছে ফলে দেশে অর্জিত প্রকৃত লাভের ওপর কর আরোপ করা যাচ্ছে না।

দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর ব্যবস্থায় ন্যায়সঙ্গতার অভাব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় করপোরেটরা যেখানে নানা ধরনের ছাড় ও সুবিধা পাচ্ছে, সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলক বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। এতে ব্যবসায়িক পরিবেশে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ভ্যাট আইনের জটিলতা এ সমস্যার একটি বড় কারণ। বর্তমানে বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাট হার, বিশেষ ছাড় এবং অব্যাহতি থাকায় পুরো ব্যবস্থাটি জটিল হয়ে উঠেছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এ জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের কর দায় কমাতে সক্ষম হচ্ছে। তারা বলছেন, প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতিও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। ভ্যাট অডিট ও তদন্ত কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি আধুনিক হয়নি। যদিও ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়নি। ফলে বড় লেনদেনগুলো রিয়েল-টাইমে নজরদারির আওতায় আসছে না।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তারা বলছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তারা কিছু ক্ষেত্রে অভিযান জোরদার করেছে। ই-কমার্স, উৎপাদন ও সেবা খাতের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ এখনো সামগ্রিক সমস্যার তুলনায় খুবই সীমিত। তারা বলছেন, ভ্যাট ফাঁকির কারণে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ছে। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ায় সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সুদের চাপ বাড়াচ্ছে। একই সাথে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে; যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই কাঠামোগত সংস্কার শুরু করা জরুরি। তারা ভ্যাট কাঠামো সরল করা, কর ছাড় কমানো, বাধ্যতামূলক ই-ইনভয়েসিং চালু করা এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা স্থানান্তর রোধ করার কথাও বলা হয়েছে।

তারা বলছেন, করপোরেট ভ্যাট ফাঁকি এখন একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তা না হলে আইনের ফাঁক ব্যবহার করে করপোরেটদের এই খেলা চলতেই থাকবে আর এর আর্থিক বোঝা বইতে হবে সাধারণ জনগণকেই।