রাজাপুরে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

Printed Edition

এনামুল হক রাজাপুর (ঝালকাঠি)

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু করে সরকার পরিবর্তনের পরও ঠিকাদারদের একটি অংশের সাথে যোগসাজশ করে তিনি অনিয়ম চালিয়ে গেছেন।

স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কাজের বিল ছাড়াতে কমিশন নেয়া, পুরনো লোহার সেতুর মালামাল বিক্রি, কাজ না করে বা নামমাত্র কাজ করে বিল তুলে নেয়া এবং নিজস্ব সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করিয়ে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা ইত্যাদি নানা অভিযোগ রয়েছে প্রকৌশলী অভিজিতের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি স্থানীয় ঠিকাদার ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম নাসিম উদ্দিন আকনের মৃত্যুর পর তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিল না পাওয়ার ঘটনা ঘিরে আরো অভিযোগ সামনে আসে তার বিরুদ্ধে।

এলজিইডি সূত্র থেকে জানা যায়, আইবিআরপি প্রকল্পের আওতায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজাপুরে ৫০টি আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, গালুয়া, নাপিতেরহাট, হাজিরহাট, শুক্তাগড় ও মোল্লারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্মিত কিছু সেতুর প্রয়োজনীয়তা ছিল না। আবার কয়েকটি সেতুর সংযোগ সড়ক না থাকায় সেগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না।

অভিযোগ রয়েছে, ৫০টি সেতুর কয়েকটিতে নকশা অনুযায়ী পাইল নির্মাণ না করে শুধু বেইজ ঢালাই করা হয়েছে। এতে প্রতিটি সেতুতে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে এ প্রকল্পে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পুরনো লোহার সেতু অপসারণের পর আরো প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মালামালও গোপনে বিক্রি করে দিয়েছেন প্রকৌশলী অভিজিৎ।

সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাইনুল হায়দার নিপু বলেন, তার ইউনিয়নে বোর্ড অফিস খালের ওপর ৮০ মিটার দীর্ঘ লোহার সেতু ভাঙার পর অধিকাংশ মালামাল উপজেলা প্রকৌশলী নিয়ে যান। পরিষদকে তা বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। গালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২১ সালের পর তার ইউনিয়নে ভাঙা লোহার সেতুর কোনো মালামাল এলজিইডি জমা দেয়নি।

এদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপির আওতায় কয়েকটি প্রকল্পের কাজ বাস্তবে শেষ না করেই শতভাগ বিল তুলে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আংগারিয়া পাকা রাস্তা থেকে খলিল মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত সলিং, আলগী জামে মসজিদ থেকে মাটির কাজ, রাজাপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার মেরামত এবং বামনকাঠি ও চরকেওতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামতের কাজ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫০ লাখ ও ২০ লাখ টাকার কয়েকটি প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টর মো: মজিবুর রহমানের মাধ্যমে উপজেলা প্রকৌশলী নিজেই বেনামে কাজ করিয়েছেন। এতে বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাৎ করেন তিনি। মরহুম নাসিম আকনের ভাই ফিরোজ আলম বলেন, ভাইয়ের মৃত্যুর পর ঋণ পরিশোধের জন্য তার অসমাপ্ত কয়েক কোটি টাকার কাজ নিজের খরচে শেষ করেন তিনি। কিন্তু বিল চাইতে গেলে তাকে বলা হয়, তার ভাই আগেই বিল নিয়ে গেছেন।

ঠিকাদার মো: শহিদ অভিযোগ করেন, নৈকাঠি-লেবুবুনিয়া সড়কের মেরামতের কাজ শেষে তার কাছ থেকে প্রকৌশলী এক লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। স্থানীয় ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা হায়দার হোসেন বলেন, এলজিইডি কার্যালয়কে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার বলেন, তার যোগদানের পর ১৭টি গার্ডার সেতু নির্মিত হয়েছে। পুরনো লোহার সেতুর তালিকা ও ছবি দফতরে সংরক্ষিত আছে এবং সেতুর মালামাল ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। টিএন্ডটি সড়কের লোহার সেতুর মালামাল ঠিকাদারের জিম্মায় রয়েছে। নাসিম আকনের ভাইয়ের বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতিরিক্ত বিলে স্বাক্ষর না করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও ঠিকাদারেরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।