যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে কিউবানরা

Printed Edition
রুটির দোকানে কিউবানদের ভিড়   : ইন্টারনেট
রুটির দোকানে কিউবানদের ভিড় : ইন্টারনেট

রয়টার্স

কমিউনিস্ট-শাসিত ক্যারিবিয়ান দেশটির ‘গলা চেপে ধরার’ মার্কিন হুমকির মধ্যেই সর্বস্তরের কিউবানরা টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমে পড়েছেন, দীর্ঘায়িত লোডশেডিং আর খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহনের বাড়তি দাম সামলানোর চেষ্টা করছেন।

এ নিয়ে রয়টার্স দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি, রাজধানী হাভানার আশপাশের এলাকার তিন ডজনের বেশি মানুষের সাথে কথা বলেছে। যাদের মধ্যে রাস্তার হকার থেকে শুরু করে বেসরকারি খাতের কর্মী, ট্যাক্সি চালক ও সরকারি কর্মীও আছেন। তাদের সবার কথায় যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, দীর্ঘ দিন মার্কিন অবরোধের চাপে পিষ্ট দেশটির বাসিন্দারা সহ্যের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। জিনিসপত্র ও সেবা, বিশেষ করে যেগুলোর সাথে ক্রমেই সীমিত হয়ে আসা জ্বালানি সরবরাহের যোগ আছে, সেগুলো দুর্লভ ও প্রতিনিয়ত আগের চেয়ে বেশি দামি হয়ে উঠছে।

গ্রামীণ কিউবার বেশির ভাগ অংশের জন্য এ চিত্র নতুন নয়। দ্বীপ রাষ্ট্রটির ভঙ্গুর ও পুরনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে কিউবানদের ভোগাচ্ছে, তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট বা পানির পাম্প কাজ করবে না এমন পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত। কিন্তু সমুদ্রের ধার ঘেঁষে থাকা রাজধানী, যেখানকার রাস্তাগুলোতে আছে সারি সারি ১৯৫০ এর আমলের গাড়ি এবং রঙিন জীর্ণ স্পেনিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের দেখা মেলে, সেখানে পরিস্থিতি কিছুকাল আগেও খানিকটা ভালো ছিল।

প্রথমে ভেনিজুয়েলা ও পরে মেক্সিকো কমিউনিস্ট দেশটিতে তেল সরবরাহ স্থগিত করায় জ্বালানি ঘাটতি বাড়তে শুরু করেছে, ফলে সঙ্কট এখন হাভানাতেও তীব্র আকার ধারণ করতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবায় তেল সরবরাহ করা দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। জানুয়ারির শুরুতে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর এই হুমকি ওয়াশিংটনের দীর্ঘ দিনের বৈরি প্রতিপক্ষ কিউবার ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করেছে।

মাদুরোর ভেনিজুয়েলা ছিল কিউবার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র, তাকে রক্ষা করতে গিয়ে ক্যারিবীয় দেশটির কয়েক ডজন সেনাকে প্রাণও দিতে হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে এমন পরিস্থিতিতে রাস্তায় লোকজন নেমে যেত। দীর্ঘ দিন ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখা কিউবায় অবশ্য এখন পর্যন্ত বিক্ষোভের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তাদের ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়েও দেয়া যাচ্ছে না।

মাত্র তিন সপ্তাহেই কিউবার মুদ্রা পেসো মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অনেকখানি বাড়িয়েছে। ‘এটা আমাকে অসম্ভব এক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য কোনো বেতনই যথেষ্ট নয়,’ বলেছেন হাভানার বাসিন্দা গৃহিণী ইয়াইতে ভারদেসিয়া।

আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাদুরোকে তার দেশ থেকে তুলে নেয়ার পর কিউবায় মার্কিন সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কতটুকু এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেছিলেন, ক্যারিবীয় দেশটিতে হামলার কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখেন না তিনি, কারণ ‘তাদের পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকেই যে যাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে’।

গত শুক্রবার কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ ‘অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন’ মার্কিন শুল্ক হুমকির পাল্টায় এক ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা’ জারির ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এ পরিস্থিতিতে দেশটিতে যে তীব্র মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা কিভাবে মোকাবেলা করা হবে সে বিষয়ে দেশটির সরকারের তরফ থেকে তেমন কিছুই বলা হয়নি। রয়টার্সের সাথে কথোপকথনে অনেক কিউবান বলেছেন, দৈনন্দিন জীবন, যা আগেই কঠিন ছিল- এখন শুধু খাবার, রান্নার জ্বালানি ও পানি জোগাড় করার মতো মৌলিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এটি আরো চোখে পড়ার মতো কঠিন হয়ে উঠেছে।

জ্বালানির এই ধাক্কা দেশটির সরকারি-বেসরকারি উভয় পরিবহন খাতেই জোর আঘাত হেনেছে। যে কারণে অনেক বাস ও বেসরকারি ট্যাক্সি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে, অন্যরা বাধ্য হয়েছে ভাড়া বাড়াতে। হাভানার পুরনো অংশে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো ২২ বছর বয়সী ডেলান পেরেজ বলছেন, কম বাস মানে আপনার এখন বাড়তি খরচে বেসরকারি পরিবহন ব্যবহার করা ছাড়া উপায় নেই।

‘আপনাকে (বাড়তি) দাম দিতে হবে, নয়তো ঘরে থাকতে হবে,’ বলেছেন তিনি। চাপে আছে বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোও। জ্বালানি ঘাটতির শহরে একসময় এ গাড়িগুলোকে মুশকিল আসান ভাবা হতো।

যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাথে চুক্তি করতে পারে : ট্রাম্প

এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাথে একটি চুক্তি করতে পারবে বলেই তার বিশ্বাস। যে দেশ কিউবায় তেল সরবরাহ করবে তাদের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে, এমন হুমকি দেয়ার ক’দিন পর শনিবার তিনি এ মন্তব্য করলেন। ফ্লোরিডা যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে কথোপকথনে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় বসতে কিউবার প্রতি আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন। ‘আমার মনে হয়, তারা সম্ভবত আমাদের কাছে আসবে ও চুক্তি করতে চাইবে। তারা এমন পরিস্থিতিতে আছে যেটা কিউবার জন্য খুবই খারাপ। তাদের কাছে অর্থ নেই। তেল নেই। তারা টিকে ছিল ভেনিজুয়েলার অর্থ আর তেলের ওপর, সেটা আর তাদের কাছে যাচ্ছে না,’ বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।