দেশের জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রে নতুন একটি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে। এ কূপ থেকে প্রতি দিন ৮০ লাখ থেকে এক কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। এভাবে গ্যাস উত্তোলন করা যাবে ১০ বছর। বর্তমানে আমদানিকৃত এলএনজির গড় মূল্য হিসেবে উত্তোলনযোগ্য এ গ্যাসের মূল্য হবে তিন হাজার ৭৩০ কোটি টাকা (প্রতি বিসিএফ ১৩৩ কোটি ২২ লাখ টাকা)।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের মোট পাঁচটি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি কূপ থেকে আগেই গ্যাস উত্তোলন হয়ে আসছে। এর মধ্যে ২০১২ সাল থেকে শ্রীকাইল-২ থেকে প্রতি দিন ৪২ লাখ ঘনফুট, ২০১৩ সাল থেকে শ্রীকাইল-৩ থেকে পাঁচ লাখ ঘনফুট, ২০১৬ সাল থেকে শ্রীকাইল-৪ থেকে ৪৯ লাখ ঘনফুট এবং সর্বশেষ ২০২০ সাল শ্রীকাইল-১ থেকে ছয় লাখ ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন উত্তোলন হয়ে আসছে।
শ্রীকাইল-৫ কূপ খননের কাজ গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে শেষ হয় গত ১৮ জানুয়ারিতে। গত ৪ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। এ কূপ খনন করতে ব্যয় হয় প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন এ গ্যাস কূপে প্রমাণিত গ্যাসের মজুদ রয়েছে ৪০ বিসিএফ। আর উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ২৮ বিসিএফ। এ গ্যাস কূপ থেকে প্রতি দিন ৮০ লাখ ঘনফুট থেকে এক কোটি ঘনফুট করে মোট ১০ বছর গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। এই হিসাব অনুযায়ী নতুন কূপ যুক্ত হওয়ার ফলে শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের পাঁচটি কূপ থেকে মোট গ্যাস সরবরাহ এখন দৈনিক প্রায় ১৭ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে।
জ্বালানি সঙ্কটে নতুন সংযোজন
মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গতকাল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী অনন্যা ইসলাম অমিত বলেন, অতীতে আমদানি নির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে দেশের জ্বালানি খাত ঝুঁকির মুখে পড়ে। বৈশ্বিক সঙ্কট দেখা দিলেই এর প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহে। তাই সরকার দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্র উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হতে পারলে যেকোনো বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলা করা সহজ হয়। বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যেই গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করেছে।’
শ্রীকাইল-৫ কূপের খনন ও প্রযুক্তিগত তথ্য
বাপেক্সের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শ্রীকাইল-৫ কূপটি একটি মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ। কূপটির মোট খনন গভীরতা প্রায় তিন হাজার ৬৮৫ মিটার। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে নিয়মিত উৎপাদনে যাবে।
পরীক্ষাকালীন উৎপাদন তথ্য
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কূপটির ডিএসটি পরীক্ষায় দুটি গ্যাস স্তর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, কূপটি থেকে প্রতি দিন গড়ে ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব।
গ্যাস মজুদ ও সম্ভাব্য উৎপাদন
বাপেক্সের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী শ্রীকাইল-৫ কূপের এফ-স্যান্ড স্তরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাসের মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৮ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলনযোগ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা মোট মজুদের প্রায় ৭০ শতাংশ।
শ্রীকাইল-৫ কূপে আরো একটি সম্ভাবনাময় গ্যাস স্তর রয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ২৫ বিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই স্তর থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি- বিশেষ করে হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে কূপটির উৎপাদন ক্ষমতা আরো বাড়তে পারে।
বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, অতীতে নানা কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার বাপেক্সকে আরো সক্ষম ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ জন্য নতুন অনুসন্ধান প্রকল্প ও প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর দেয়া হচ্ছে।
আগামী ৫ বছরের পরিকল্পনা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে দেশের গ্যাসের চাহিদা প্রতি দিন প্রায় চার হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছতে পারে। এই চাহিদার বড় একটি অংশ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, পুরনো ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীকাইল-৫ কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হওয়া দেশের জ্বালানি খাতে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। যদিও এর উৎপাদন জাতীয় মোট চাহিদার তুলনায় খুব বেশি নয়, তবে দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাস যুক্ত হওয়া সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রেক্ষাপটে শ্রীকাইল-কূপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



