যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নানা বাণিজ্যিক বাধা ও ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে আগ্রাসী কৌশল নিয়েছে চীন। মূল্য ছাড় দিয়ে বাজার দখলের এই প্রতিযোগিতায় সরাসরি চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প এখন প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি মূল্য প্রতিযোগিতার দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। দেশের তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা বলছে, প্রস্তুতি ও সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে সামনে ঝুঁকি আরো বাড়বে।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পুরো ইইউ অঞ্চলে তৈরি পোশাক আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো, যেখানে মোট প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে পরিমাণগত দিক থেকে আমদানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ইউনিটমূল্য কমেছে প্রায় ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপে বেশি পরিমাণ পোশাক ঢুকলেও গড় দাম কমেছে যা মূল্য প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইইউতে ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ মাঝামাঝি অবস্থানে থাকলেও বাজার ধরে রাখতে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। একই সময়ে চীন ইইউতে রফতানি করেছে ২৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবৃদ্ধির এই চিত্রের পেছনে রয়েছে মূল্য কমানোর কৌশল। বাংলাদেশ ইউনিট মূল্য ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমিয়ে রফতানি পরিমাণ ধরে রেখেছে। অন্য দিকে চীন ইউনিট মূল্য কমিয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ চীন আরো বড় পরিসরে মূল্য ছাড় দিয়ে বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।
এদিকে দ্বিতীয় সারির রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ভারত ইইউ বাজারে ৮ শতাংশ, কলোম্বিয়া ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং পাকিস্তান ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তুরস্কের রফতানি ১৩ শতাংশ কমেছে, এবং মরক্কো আগের অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়া দেশগুলোর মোট রফতানি আয় বাংলাদেশের এক-চতুর্থাংশ বা তারও কম। চীনের তুলনায় তাদের অবস্থান আরো ছোট।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের রফতানি কমে যাওয়ায় দেশটি ইউরোপে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশটিতে দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানিকারক চীনের অংশগ্রহণ কমেছে ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ১১.৩৫ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের রফতানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রে চাপে পড়া চীন ইউরোপে মূল্য ছাড় দিয়ে প্রতিযোগিতা জোরদার করছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশের পোশাক শিল্প ইতোমধ্যে উৎপাদন ব্যয়ের চাপের মধ্যে রয়েছে। শ্রমমজুরি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয়, পরিবহন ব্যয় এবং বন্দর জটিলতা সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আরো মূল্য কমিয়ে রফতানি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, ইইউতে আমরা ইচ্ছা করলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। চীন যেখানে দাম কমিয়ে রফতানি বাড়াচ্ছে, সেখানে আমাদেরও প্রতিযোগিতা করতে হবে। তবে শুধু দাম কমিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, দক্ষতা বাড়াতে হবে। ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে খরচ কমানো যাবে না।
তিনি বলেন, ডিজেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে শিল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকলে কারখানার উৎপাদনশীলতা কমে। এতে লিড টাইম বাড়ে, যা ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়।
এ দিকে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আমরা অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার কারণে এখনো বাজার ধরে রেখেছি। কিন্তু মূল্য কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বাড়ানো সম্ভব নয়। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর শ্রম ও অন্যান্য কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে চাপ আরো বাড়বে। তাই লিড টাইম কমানো ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও বন্দর সমস্যার কারণে লিড টাইম বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা দ্রুত সরবরাহ চান। সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে তারা বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকে পড়েন। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। সাধারণ মানের পোশাক রফতানিতেই যখন নানা চ্যালেঞ্জ, তখন বেশি দামের ও মূল্য সংযোজিত পণ্যে প্রবেশ করতে হলে বড় ধরনের প্রস্তুতি দরকার।
খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হবে। চীন প্রযুক্তি ও স্কেলে এগিয়ে। ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পাচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তানও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি স্থিতিশীলতা এবং লজিস্টিক দক্ষতা উন্নয়ন।
এলডিসি উত্তরণের পর ২০২৬ সালের পর থেকে শুল্ক সুবিধা কমে গেলে প্রতিযোগিতা আরো কঠিন হবে। বর্তমানে ইউরোপে জিএসপি সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে। ভবিষ্যতে তা সীমিত হলে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান আরো দুর্বল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল মূল্য কমিয়ে বাজার দখলের চেষ্টা টেকসই নয়। দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তি বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, স্বয়ংক্রিয়তা এবং পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। একই সাথে আর্থিক খাতে সহায়তা প্রয়োজন বিশেষ করে সুদহার কমানো ও কার্যকর নগদ সহায়তা নীতি বজায় রাখা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব মিলিয়ে ইউরোপের বাজারে চীনের আগ্রাসী মূল্য কৌশল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধি এখনো ইতিবাচক হলেও ঝুঁকি বাড়ছে। প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে সঙ্কট ঘনীভূত হতে পারে। তাই এখনই উৎপাদন দক্ষতা, অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তায় জোর না দিলে আগামী বছরগুলোতে বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।



