নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো
কক্সবাজারের উখিয়া এবং টেকনাফে ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দাতা সংস্থা ও দেশগুলোর সহায়তা সঙ্কুচিত হতে হতে এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে এক দিকে ক্যাম্পগুলোতে মানবিক সঙ্কট দেখা দিচ্ছে, অন্য দিকে খাবার ও কাজের সন্ধানে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমাতে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হচ্ছে। একই সাথে গড়ে উঠছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা কেন্দ্রিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সঙ্কটের কারণ হতে পারে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত। এমনি পরিস্থিতিতে জেনেভায় আসন্ন রোহিঙ্গা শরণার্থী সংক্রান্ত ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে দাতা সংস্থাগুলোর সামনে বাংলাদেশের পক্ষ হতে জোরালো ভূমিকার প্রত্যাশা করছেন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের আরাকানে সামরিক বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢল নামে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এই রোহিঙ্গা ঢল নামার পর হতেই বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং দাতা দেশগুলো এই জনগোষ্ঠীর মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অর্থায়ন করে আসছে। আর বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের মাধ্যমে ইউএনএইচসিআর, আইওএম, ডব্লিউএফপি, ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন, ইউএনএফপিএ, ডব্লিউএইচও-সহ আন্তর্জাতিক এনজিও, দেশীয় এনজিও এবং অন্যান্য দেশের সরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের সংস্থা সমন্বয় করে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় কাজ করে আসছে। গত প্রায় ৯ বছর ধরে এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চলে আসছিল।
সূত্র জানিয়েছে, বছরে এক বিলিয়ন ডলারের মতো মানবিক সহায়তা তহবিল আসতো রোহিঙ্গাদের জন্য। যা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জীবন-মান উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এভাবে চললেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পরিবর্তনে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে এই মানবিক সহায়তা। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর মানবিক সহায়তা অর্ধেকে নেমে আসে জানিয়ে সূত্র বলছে- রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং গালফ কান্ট্রিগুলোর অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সঙ্কুচিত হওয়ার পর ইইউর সহায়তাও সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ফলে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জোগান এক বিলিয়ন ডলারের অর্ধেকে নেমে এসেছে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ক্যাম্পগুলোতে। মানবিক সহায়তা তহবিলের জোগান কমার ফলে অপুষ্টিজনিত সমস্যা দিন দিন বাড়ছে, স্বাস্থ্য সেবার ক্রমাবনতি ঘটছে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না, ফলে আশ্রয়স্থলগুলো ভেঙে যাচ্ছে, ভূমিধ্বস হচ্ছে। রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত খাবার এবং কাজের সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে চলে যাচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতরে চুরি-ডাকাতি বাড়ছে। এই সুযোগে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গা যুবকদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলছে স্বেচ্ছায় বা বাধ্যতামূলকভাবে। তাদেরকে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানে ব্যবহার করা হচ্ছে। তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অব্যাহত চাপের মুখে পালিয়ে গিয়ে মানবপাচারের শিকারও হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকাডুবে শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত বা নিখোঁজের ঘটনা এর বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। প্রায় মৃত্যুমুখে ঠেলে দিলেও কোনো উপায় না দেখেই তারা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে পা বাড়ায় বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তা ছাড়া ক্যাম্পের অভ্যন্তরে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা যুবক টিকে থাকার উপায় হিসেবে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে জড়িয়ে পড়ছে। আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা তরুণকে জোরপূর্বক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, পাঁচ হাজারের বেশি তরুণ রোহিঙ্গা পুরুষকে জোরপূর্বক বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। যা শরণার্থীশিবির ও সীমান্তবর্তী এলাকায় ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে বলেও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় হয়তো স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর তাদের খবরদারি চলবে এমন আশঙ্কাও করেন কোনো কোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক বেশ ক’টি সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি), আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) ও আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ)। এ ছাড়াও রয়েছে অর্ধডজনের বেশি ছোট-খাট গ্রুপ। এসব সশস্ত্র গ্রুপগুলোর দ্বন্ধে ক্যাম্পগুলোতে প্রতিনিয়তই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। উল্লেখিত তিনটি সশস্ত্র গ্রুপের দ্বন্ধেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংঘটিত হয় বলে নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে। অস্ত্র ও মাদক কারবারিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সেখানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও অভিযোগ রয়েছে, সেখানে কর্মরত বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার ইন্দনে রোহিঙ্গাদের নেতৃত্ব শূন্য করতেই উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে হত্যা করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে কাজ করে মূলত পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার সীমান্তবর্তী এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দাবি করছে ক্যাম্পগুলোতে সীমান্তের চাইতে দেশের অভ্যন্তর হতে অস্ত্রের জোগান আসছে।
বিজিবি রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মো: মহিউদ্দীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় উখিয়ায় একটি নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং কক্সবাজার রিজিওনের আওতায় আরো দু’টি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে সরকার বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনার পাশাপাশি আধুনিক থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম, রাডার ও ড্রোন সার্ভিল্যান্স প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজিবি অবৈধ অস্ত্র ও মাদকপাচার প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
তিনি আরো বলেন, সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অবস্থান নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সংবেদনশীল। কঠোর নজরদারির পরও সীমান্ত অতিক্রম করে যাতায়াতের কিছু প্রবণতা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠনের অস্তিত্ব নেই বলে তিনি দাবি করেন।
মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ নয়া দিগন্তকে বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ডিপ্লোমেসি ঠিকমতো কাজ করছে না। ফলে তাদের মাঝে এক ধরনের হতাশা এবং অনিশ্চয়তা কাজ করছে। মিয়ানমার এমন একটা দেশ তারা অস্ত্রের ভাষা ছাড়া কিছুই বুঝে না। একমাত্র রোহিঙ্গারাই অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি। ফলে একমাত্র তাদেরকেই সামরিক জান্তার নিগ্রহের শিকার হতে হয়। আরাকান আর্মি ড্রাগ বিজনেস করেই অস্ত্রপাতির টাকা জোগাড় করছে। ড্রাগটাই ওয়ার ফাইন্যান্সিং করছে এবং সেই ড্রাগটা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকতেছে। তিনি বলেন, নতুন সরকারের বয়স মাত্র তিন মাস। এর আগের সরকারগুলোও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তেমন কোনো ক্লিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ডেভেলপ করতে পারেনি। তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের ভেতরেও কিছু ভালো নেতা ছিল। তাদেরকে হয় মেরে ফেলা হয়েছে, নয়তো ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, নয়তো বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একটি অংশও চায় না এই সমস্যার সমাধান হোক।
তারা নিজেদের এমপাওয়ার মেন্টের জন্যই ড্রাগ এবং অস্ত্রের ব্যবসায় ঝুকছেন বলেও এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করছেন। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে গড়ে উঠলেও আন্তর্জাতিক রেডিকেল গ্রুপগুলো সুবিধা করতে পারেনি বলে দাবি করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে তাদের রিক্রুটিং গ্রাউন্ডে পরিণত করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার এবং সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে। বিছিন্নভাবে দুই/একজন গেলেও যেতে পারে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ সহায়তা সঙ্কুচিত হয়েছে। প্রায় সকল খাতেই সঙ্কোচন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শেল্টার, সাইট ম্যানেজমেন্ট, খাদ্য, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রোটেকশান, লজিস্টিকস। বছরে এক বিলিয়ন ডলার সহায়তা আসত। কিন্তু বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সহায়তা কমার ফলে অপুষ্টি, স্বাস্থ্য সেবার নিম্নগতি, শেল্টার মেরামত হচ্ছে না ফলে আশ্রয়স্থলগুলো ভেঙে যাচ্ছে, ভূমিধস হচ্ছে, রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত খাবার এবং কাজের সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে চলে যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে। ক্যাম্পের ভেতরে চুরি-ডাকাতি বাড়ছে। তিনি জানান, সহায়তা সঙ্কুচিত হওয়ায় সীমান্তে মাদকসহ অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান বেড়ে যেতে পারে। তা ছাড়া এটি প্রধান কারণ না হলেও এটার মাধ্যমে মানবপাচার (হিউম্যান ট্রাফিকিং)ও এনকারেজ হতে পারে। তিনি জানান, আমরা এসব বিষয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরছি। এ মাসের শেষ দিকে জেনেভায় রোহিঙ্গা শরণার্থী সংক্রান্ত ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে দাতা সংস্থাগুলোর সামনে বাংলাদেশ বিষয়টি তুলে ধরবে।



