মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বৈশ্বিক শিপিং খাতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরানের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো জরুরি ভিত্তিতে নানা ধরনের অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করায় বাংলাদেশের রফতানি ও আমদানিকারকরা বাড়তি খরচের মুখে পড়েছেন। নতুন করে আরোপিত এই সারচার্জের কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ডেলিভারিতে বিলম্ব এবং সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহে বিঘেœর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক বড় বড় শিপিং লাইনগুলো ইতোমধ্যে ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’, ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ এবং ‘ইমার্জেন্সি ফুয়েল সারচার্জ’ নামে বিভিন্ন অতিরিক্ত ফি আরোপ শুরু করেছে। প্রতি কনটেইনারে এসব অতিরিক্ত চার্জ ৫০০ ডলার থেকে শুরু করে চার হাজার ডলার পর্যন্ত গড়াচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় কাঠামোকে বড় ধরনের চাপে ফেলছে। বিশেষ করে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন বন্দর থেকে এবং ওইসব বন্দরের উদ্দেশ্যে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এসব অতিরিক্ত চার্জ কার্যকর হয়েছে। একই সাথে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রায় সব রুটেই জরুরি জ্বালানি সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাথে নতুন কার্গো বুকিং সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেয় বেশ কয়েকটি বড় শিপিং কোম্পানি। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং সেখানে হামলার ঘটনা ঘটছে। ফলে অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ রুট ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা খরচ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে বুকিং স্থগিত থাকলেও, ইতোমধ্যে পাঠানো বা পথে থাকা কনটেইনারগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন সারচার্জ প্রযোজ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছে শিপিং কোম্পানিগুলো। এতে করে রফতানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের কনটেইনারভিত্তিক রফতানি পণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশই চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডেনমার্কের মার্স্ক লাইন, সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি), ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম এবং জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েড।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এসব কোম্পানি ভিন্ন ভিন্ন হারে অতিরিক্ত চার্জ নির্ধারণ করেছে। মার্চের শুরুতে মার্স্ক লাইন উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশের জন্য জরুরি ভাড়া বৃদ্ধি ঘোষণা করে। নতুন নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী, ২০ ফুট কনটেইনারে এক হাজার ৮০০ ডলার, ৪০ ফুট কনটেইনারে তিন হাজার ডলার এবং রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে তিন হাজার ৮০০ ডলার পর্যন্ত চার্জ ধার্য করা হয়েছে।
অন্য দিকে এমএসসি ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পূর্ব আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে প্রতি কনটেইনারে ৫০০ থেকে এক হাজার ডলার পর্যন্ত ওয়ার সারচার্জ আরোপ করেছে। একই সাথে ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে এশীয় রুটগুলোতে অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জও যুক্ত করেছে।
সিএমএ সিজিএম উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট প্রিমিয়াম’ চালু করেছে, যেখানে ২০ ফুট কনটেইনারে দুই হাজার ডলার, ৪০ ফুটে ৩ হাজার ডলার এবং রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে চার হাজার ডলার পর্যন্ত চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে নতুন করে ফুয়েল সারচার্জ আরোপ করেছে কোম্পানিটি।
জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েড রিস্ক সারচার্জ হিসেবে ২০ ফুট কনটেইনারে এক হাজার ৫০০ ডলার এবং রেফ্রিজারেটেড কনটেইনারে তিন হাজার ডলার পর্যন্ত চার্জ আরোপ করেছে। এছাড়া প্রায় সব রুটেই ৭০ থেকে ২২৫ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি চার্জ কার্যকর করেছে।
এদিকে স্থানীয় একটি বিদেশী শিপিং কোম্পানির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ পরিচালনায় ঝুঁকি বেড়েছে এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের ফলে অপারেশনাল খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এই বাড়তি খরচ সামাল দিতেই এসব সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রফতানি খাতে। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশ থেকে মসলা, সরিষার তেল, বিস্কুট, নুডলস, চিঁড়া, চানাচুরসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করা হয়। মূলত ওইসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরাই এসব পণ্যের প্রধান ভোক্তা।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন ডলারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি হয়। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজার টিইইউ কনটেইনার এসব দেশে পাঠানো হয়। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার আটকে পড়েছে। চট্টগ্রামের বেসরকারি কনটেইনার ডিপো, বন্দর এবং কলম্বোসহ বিভিন্ন ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্টে অন্তত এক হাজার টিইইউ কনটেইনার স্থবির অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
দেশের শীর্ষ খাদ্যপণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএলের রফতানি পণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর দেশগুলোতে পাঠানো হয়ে থাকে।। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের প্রায় ৪০০ টিইইউ কনটেইনার বিভিন্ন জাহাজ ও ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে আটকে আছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আটকে থাকা এসব কনটেইনারের জন্য অতিরিক্ত সারচার্জ গুনতে হবে, যা কোম্পানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। তিনি জানান, বিকল্প রুট খুঁজতে শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সৌদি আরবের জেদ্দা বন্দরই কার্যত একমাত্র বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এই রুটে কনটেইনার প্রতি ভাড়া দুই হাজার ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে ছয় হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছেছে, যা রফতানিকারকদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
এদিকে, শুধু রফতানিই নয়, আমদানিতেও এর প্রভাব পড়ছে। তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে চীন থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৪০ ফুট কনটেইনার ভাড়া এক হাজার ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে দুই হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিজিএমইএ এর তথ্যে দেখা যায়, ইউরোপগামী রুটেও ভাড়া বেড়েছে। বর্তমানে ২০ ফুট কনটেইনারে প্রায় এক হাজার ৪০০ ডলার এবং ৪০ ফুট কনটেইনারে দুই হাজার ডলার খরচ হচ্ছে, যার সাথে নতুন জ্বালানি সারচার্জ যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, এভাবে শিপিং খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে যেখানে মূল্য সংবেদনশীলতা বেশি, সেখানে পণ্যের দাম বাড়লে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে এর প্রভাব আরো গভীর হতে পারে। এতে শুধু শিপিং খরচ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাণিজ্য প্রবাহ সব কিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিকল্প রুট ব্যবহার, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং খরচ কমানোর কৌশল গ্রহণ না করলে রফতানি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে তা এখনো অনিশ্চিত। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিপিং খরচের এই ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আমদানি ও রফতানিকারকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।



