অংশীজনদের উদ্যোগে পতন থামল

ফের স্বাভাবিক হচ্ছে পুঁজিবাজার

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দু’সপ্তাহের ধারাবাহিক পতন থেমে ফের স্বাভাবিক হতে চলেছে দেশের পুঁজিবাজার। সূচক ও লেনদেনের অস্বাভাবিক অবনতি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। একই সময় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসি নিয়ে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কোনো মহল কর্তৃক নানা ধরনের গুজব ছড়ালে বাজারের পতনের ধারা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এতে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পৌঁছে তলানিতে।

গত সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটতে শুরু করে। আগের দু’ সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি ৩০০ পয়েন্টের বেশি অবনতি ঘটে। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রধান সূচকটি একই সময় হারিয়েছে প্রায় ৫০০ পয়েন্ট। পুঁজিবাজারের এ পরিস্থিতিতে সঙ্কট উত্তরণে এগিয়ে আসে বাজারের অংশীজনদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও সব কমিশনারের উপস্থিতিতে সব অংশীজনকে নিয়ে সংগঠনটি উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে যেখানে অংশীজনদের সব পক্ষ সঙ্কট কাটাতে যার যার অবস্থান থেকে পরামর্শ প্রদান করে।

আলোচনা শেষে বিএসইসি চেয়ারম্যান নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বিগত দুই মাসে কমিশন কর্তৃক নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে অংশীজনদের অবহিত করেন। তিনি দ্রুততম সময়ে কমিশন আরো কী কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কেও উপস্থিত অংশীজনদের অবহিত করেন। ডিবিএর নেয়া এ উদ্যোগ বাজারের অংশীজনদের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মাঝেও ইতিবাচক বার্তা দেয়, যা পরদিন থেকেই বাজারের ধারাবাহিক পতন ঠেকায়। পরবর্তী তিন কর্মদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে প্রায় ৬৫ পয়েন্ট, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।

গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৬ দশমিক ৪১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। রোববার পাঁচ হাজার ৬৫৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে স্থির হয় পাঁচ হাজার ৬৬২ দশমিক ০৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮৫ ও ৫ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট। সপ্তাহের প্রথম দু’টি কর্মদিবসে বাজারটি প্রধান সূচকটির প্রায় ৫৭ পয়েন্ট হারিয়েছিল।

সপ্তাহের শেষ তিন কর্মদিবসে বাজার সূচকের উন্নতি এ সময় ডিএসইর লেনদেনেরও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। ৩১ আগস্ট বাজারটির লেনদেন যেখানে ৪৭৭ কোটিতে নামে সেখানে মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে ২ সেপ্টেম্বর বাজারটির লেনদেন পৌঁছে যায় ৭৩১ কোটি টাকায়। তবে সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার বাজারে বিক্রয়চাপ পুনরায় সক্রিয় হলে ৭২০ কোটিতে নামে লেনদেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা এ মুহূর্তে অনেকটা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে পার করছে। সেখানে পুঁজিবাজারের খুব বেশি ভালো পারফর্ম করার সুযোগ নেই। তারপরও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা গেলে বর্তমান মূল্যস্তরে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে। কারণ এ মুহূর্তে বাজারের গড় মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) ৯-এর নিচে, যা বিনিয়োগের জন্য অনেক ভালো অবস্থান নির্দেশ করে। তা ছাড়া সামনে তালিকাভুক্ত কোম্পানির একটি বড় অংশই বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি লভ্যাংশ ঘোষণা করবে। তাই এ সময়টিকে সক্ষম বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের জন্য বেছে নেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এ সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারেন।

পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য কমিশনের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, বাজারে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি যাতে বাজারে গভীরতা বাড়বে এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। কমিশনের নেয়া ডিরেক্ট লিস্টিং-এর পাশাপাশি আইপিওর যে খরা তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূর করা সম্ভব হবে তত তাড়াতাড়ি পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক আচরণ ফিরে পাবে।

গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল তিন হাজার ৪০ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৭৫৮ কোটি টাকা বেশি। আগের সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল দুই হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। এ সময় বাজারটির গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৬০৮ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। আগের সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন ছিল ৫৭১ কোটি টাকা।

বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের সায়হাম টেক্সটাইলস। সপ্তাহে গড়ে কোম্পানিটির ৩১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ২২ শতাংশ। গড়ে ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা লেনদেন করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। ডিএসইর সাপ্তাহিক মোট লেনদেনের ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ দখলে রাখে কোম্পানিটি। লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, সায়হাম কটন মিলস, আইপিডিসি, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলস, ব্র্যাক ব্যাংক, লাভেলো আইসক্রিম ও ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং লি.।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানি ছিল সায়হাম কটন মিলস। টেক্সটাইল খাতের এ কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ সময় দ্বিতীয় স্থানে ছিল প্রকৌশল খাতের কোম্পানি নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, সাফকো স্পিনিং, ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, পিএফআই ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, মালেক স্পিনিং ও ইসলামিক কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স লি.।