ইতিহাসের এক বিরল ব্যক্তিত্ব

এলাহী নেওয়াজ খান

Printed Edition

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের জাতীয় ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে সমরনায়ক থেকে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছেন এমন ক্ষণজন্মা যে কয়জন ব্যক্তিত্ব আছেন তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম। যারা তাকে নানাভাবে ছোট করার অপচেষ্টা করে তারা ইতিহাসে সব সময়ই অপ্রাসঙ্গিক থেকে যাবে। আমরা যখন তাকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি তখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার কিংবদন্তি সমরনায়ক জর্জ ওয়াশিংটন ও ফ্রান্সের চার্লস দ্য গলের গৌরবগাথা। জিয়াউর রহমানকে কেবল ওই দুই কিংবদন্তি সমরনায়ক ও রাষ্ট্রনায়কের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তারা উভয় যেমন যুদ্ধ করতে করতে দেশ স্বাধীন করে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছিলেন, জিয়াউর রহমানও রণাঙ্গনের অসম সাহসী সমরনায়ক থেকে জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন যেমন যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন তেমনি রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রূপকারও ছিলেন তিনি। একইভাবে চার্লস দ্য গল ফ্রান্সের ফ্রি আর্মির কমান্ডার হিসেবে জার্মানির দখলদারিত্ব থেকে ফ্রান্সকে যেমন মুক্ত করেছিলেন তেমনি পঞ্চম রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফ্রান্সের গৌরব ও সম্মান বিশ্ব দরবারে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও ওই একই গুণে গুণান্বিত। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, অন্য দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যোদ্ধাদের নেতৃত্বদানকারী অসম সাহসী এক সেনাকমান্ডার। পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত একদলীয় বাকশালী শাসন থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রবেশ ছিল উল্কার মতো। আগ্রাসী ভারত ও তার আওয়ামী সহযোগীদের নিবর্তনমূলক শাসন ধারার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। মধ্য, বাম ও ডানসহ সব মত-পথের সমন্বয়ে ঘটিয়ে তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের যে ভিত্তি রচনা করেছিলেন তা আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল, যা এখনো আমরা অনুভব করি গভীরভাবে। গত জুলাই বিপ্লবে ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তা মূলত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্তর্নিহিত চেতনা থেকেই উৎসারিত হয়েছিল।

জিয়া ছিলেন এক দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমরবিদ, রাজনীতিক, রাষ্ট্রনায়ক; অন্য দিকে একজন সফল সংস্কারক। ক্ষণজন্মা এই মহান রাষ্ট্রদায়ক হচ্ছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সততা ও অসাধারণ দেশপ্রেমের নজির তিনি নিজেই। তার শাহাদত বরণের পর ৪৪ বছর কেটে গেছে; কিন্তু তার সমকক্ষ কোনো রাজনীতিবিদের আবির্ভাব আর বাংলাদেশে ঘটেনি। তিনি নিজেই নিজের দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন।

তবে এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না, তার স্ত্রী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া স্বামীর রাজনীতির ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে গেছেন আন্তরিকভাবে। তিনিই জিয়াউর রহমানের সমন্বয়ের রাজনীতি অব্যাহত রেখেছিলেন সমমনাদের নিয়ে একের পর এক জোট গঠনের মধ্য দিয়ে। সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি গঠন করেছিলেন সাতদলীয় জোট। এরপর চারদলীয় জোট এবং সবশেষে শেখ হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসনের বিরুদ্ধে ২০ দলীয় জোট গঠন করেছিলেন। শত প্রতিকূলতা, শত প্রতিবন্ধকতা, শত অপপ্রচার সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া কখনোই জিয়াউর রহমানের সমন্বয়ের রাজনীতি থেকে সামান্য বিচ্যুত হননি।

একটি রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রয়োজন ছিল সব দল মত ও পথকে একত্র করে দেশ পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা। দরকার ছিল ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠনে সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো। কিন্তু তখন আওয়ামী লীগ সবাইকে অবজ্ঞা করে এককভাবে সরকার গঠন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার যে নীতি গ্রহণ করে তা দেশ ও জাতিকে চরমভাবে বিভক্ত করে ফেলে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেটি গভীরভাবে উপলব্ধি করে একটি সমন্বয়ের রাজনীতির সূচনা করেছিলেন। সেই রাজনীতির ফলে একাত্তরে নিন্দিত ভূমিকা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ নেতা খানে সবুর ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনটি আসনে বিজয়ী হয়ে পার্লামেন্টে এসেছিলেন। একইভাবে নিন্দিত ভূমিকা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের সভাপতি মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে। কিন্তু জাতীয় ঐক্য গঠনের স্বার্থে জিয়াউর রহমান তা করেননি। যাদু মিয়াকে সিনিয়র মন্ত্রী করে সন্তুষ্ট রেখেছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান আরো বৃহত্তর আঙ্গিকে মূল্যায়ন করে একাত্তরের ভূমিকার কারণে নাগরিকত্ব হারানো জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম আযমকে বাংলাদেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তারপর তিনি আদালতের রায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব ফেরত পান। শুধু তাই নয়, ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতা মাওলানা আব্দুর রহীমের নেতৃত্বে গঠিত ‘ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ’ নামে একটি জোটের ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচন করারও সুযোগ করে দেয়া হয়। অন্যান্য ইসলামী দল এই জোটের মাধ্যমে নির্বাচন করার সুযোগ লাভ করে। ওই নির্বাচনে এই জোট ছয়টি আসনে বিজয় লাভ করেছিল। আরো মজার ব্যাপার ছিল- যারা একাত্তর সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এই যুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলে অভিহিত করেছিল, সেই কমিউনিস্টদের নেতা মোহাম্মদ তোয়াহাকেও নির্বাচনের অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিয়ে পুনর্বাসিত করেছিলেন।

অথচ ১৯৭২-৭৫ আওয়ামী শাসন আমলে ইসলামী দলসহ কমিউনিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড দলগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামী দলগুলোর জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। সেই জোটে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্য জোট নামে দু’টি ইসলামী দল ছিল। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া এই জোটকে আরো সম্প্রসারণ করেছিলেন, কার্যত যা শেষতক ২০ দলীয় জোটে পরিণত হয়। এটি ছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আজ খালেদা জিয়া বেঁচে নেই। বহুদিন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারেননি। তার অনুপস্থিতিতে কোথায় যেন বিএনপির রাজনীতির একটি ছন্দপতন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে দলটির নেতা-মন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বেশ কিছু বক্তব্য-বিবৃতি, স্লোগান শুনে মনে হচ্ছে, কোথাও যেন দলটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দল থেকে একটি দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। হতে পারে এটি ভোটের রাজনীতির কৌশল। যেমন করে ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট করে বিএনপি বিশাল বিজয় লাভ করেছিল। সেটি ছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি নিখুঁত ভোটের হিসাব। সে কারণে সেই নির্বাচনে চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে। হতে পারে বর্তমানে বিএনপি এ ধরনের একটি হিসাব থেকে অতীতের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের পথ পরিহার করে হয়তো নতুন কোনো মেরুকরণ করার চেষ্টা করছে। তবে ভবিষ্যৎই জানে এই নতুন রাজনীতির সাফল্য কতটা বিএনপির ঘরে আসবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই ধারণা, শহীদ জিয়ার সমন্বয়বাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুতির ফল শুভ না-ও হতে পারে। বিএনপি সময় থাকতে এই বাস্তবতা বুঝলেই দল ও দেশের জন্য মঙ্গল। হ

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক