১৮ জুলাই ’২৪ : জ্বলে উঠা আগুন

যে রাষ্ট্রে মেধা নয়, পরিচয়ই চূড়ান্ত; যেখানে যোগ্যতা নয়, প্রজন্মগত সুবিধা নিয়েই নিয়োগ হয়। সেই রাষ্ট্রে কিভাবে আশা করা যায় একটি প্রজন্ম মাথা নিচু করে থাকবে?

Printed Edition

ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ

কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হঠাৎ করে হয় না। গভীর অন্তঃস্থলে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকে উত্তাপ, জমে ওঠে বিক্ষোভ, অসন্তোষ, ক্ষোভ যার বিস্ফোরণ একসময় অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি, ২০২৪ সালের বাংলাদেশে ছাত্রসমাজের ভেতরে জমে উঠেছিল এক দগ্ধ আগুন, যা অপেক্ষা করছিল শুধু সময়ের। শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য ছিল বহু দিনের পুরনো ক্ষত। কিন্তু সেই ক্ষতের ওপর নতুন করে লবণ ছিটিয়ে দিয়েছিল কোটা সংস্কার নিয়ে সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্ত। যে রাষ্ট্রে মেধা নয়, পরিচয়ই চূড়ান্ত; যেখানে যোগ্যতা নয়, প্রজন্মগত সুবিধা নিয়েই নিয়োগ হয়। সেই রাষ্ট্রে কিভাবে আশা করা যায় একটি প্রজন্ম মাথা নিচু করে থাকবে? ছাত্ররা প্রশ্ন তুলেছিল কেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হবে কেবল সে কোনো কোটা-বিশেষের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে? কেন দেশের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও কেউ একজন চাকরির সুযোগ পাবে না, কেবল তার জন্মসনদে একটি ‘সুবিধাজনক পরিচয়’ লেখা নেই বলে?

২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকেই এই প্রশ্নে দেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষিপ্ত আন্দোলন, অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন চলছিল। কিন্তু শাসকের চোখে এসব ছিল কেবল ‘অসন্তুষ্ট কিছু ছাত্রের ফুঁপিয়ে ওঠা’, যাকে লাঠিপেটা করে, হুমকি দিয়ে, জেল দেখিয়ে থামিয়ে দেয়া যাবে। কিন্তু শাসকেরা ভুলে গিয়েছিল এই প্রজন্ম আর ২০১৮ বা তার আগের মতো নয়। তারা সোচ্চার, সংগঠিত এবং সামাজিক মাধ্যমে অতিদ্রুত জাগ্রত। এই তরঙ্গ গিয়ে আছড়ে পড়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কিছু উদ্যমী ছাত্র সংগঠক, যাদের মধ্যে কেউ ছিল সাধারণ ছাত্র, কেউ ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ, কেউবা আগে কোনো আন্দোলনে ছিল না তারা একত্র হয়। তারা জানত, এই আগুন কেবল কুমিল্লায় নয়, জ্বলছে গোটা দেশে। তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবার চূড়ান্ত আওয়াজ তুলতে হবে। এ দিকে সরকার ও দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী ফাঁদ পাতছিল প্রতিটি মিছিলে। কেউ চিহ্নিত হলে পরে তাকে তুলে নেয়া হতো, গুম হতো। রাতের আঁধারে বাড়িতে পুলিশ হানা দিত। তবুও ভয় পায়নি কেউ। ছাত্ররা ঘুমহীন রাত কাটিয়ে প্ল্যাকার্ড বানাত, পোস্টার ছাপাত, সামাজিক মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিত যেন এই বিদ্রোহ চাপা না পড়ে। এর মধ্যেই আসে ঘোষণা ১৮ জুলাই ২০২৪, সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। অফিস-আদালত, যানবাহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব থেমে যাবে। পথে নামবে ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তারা মুখর হয়ে উঠবে। এই ঘোষণা যেন একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিতে প্রথম পাথরটি নিক্ষেপ। চার পাশে গর্জে ওঠে শিক্ষার্থীরা। কুমিল্লায় ছাত্ররা প্রস্তুতি নেয়, যোগাযোগ করে শহরের স্কুল-কলেজগুলোর ছাত্রদের সাথে। সম্মিলিত প্রতিরোধের জাগরণে তারা বলেছিল,‘আমরা আর পিছিয়ে থাকব না। এবার কণ্ঠস্বর থামবে না। কোটবাড়ি সাক্ষী হবে নতুন ইতিহাসের।’ ভোরের আলো ফোটার আগেই অনেকেই প্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। কেউ পকেটে পাথর নিয়েছে, কেউ স্লোগান লিখে মনে রাখার চেষ্টা করেছে, কেউ নাশতা না খেয়ে রওনা দিয়েছে। তাদের চোখে ছিল আশার আগুন, মনে ছিল ন্যায়ের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠা এক প্রবল বিশ্বাস। কারণ তারা জানত, যদি আজ চুপ থাকে,তবে কাল আর মুখ তুলেও দাঁড়ানো যাবে না। তারা জানত, সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর। ১৮ জুলাইয়ের সকাল ছিল তাই এক যুদ্ধের আগে জেগে ওঠা এক দেশপ্রেমিক সূর্যোদয়।

প্রতিটি বিপ্লবের আগে থাকে এক নীরব প্রস্তুতি। বাইরে থেকে হয়তো দেখা যায় না কিছু, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গজিয়ে ওঠে প্রতিরোধের অদৃশ্য পাঁজর, রক্তের ভেতর জন্ম নেয় সাহস। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভেতরে এমনই এক প্রস্তুতি জেগে উঠেছিল ১৮ জুলাইয়ের আগের দিনগুলোতে। কোটবাড়ি বিশ্বরোড এই শব্দটি হয়তো রাজধানীবাসী ও দেশের মানুষের কাছে ছিল কেবল একটি রাস্তার মোড়ের নাম। কিন্তু আন্দোলনের ছাত্রদের কাছে এটি ছিল ঘরের উঠোন, লড়াইয়ের ফাঁকা ময়দান, যেখানে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লেখা সম্ভব। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে গাড়িতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পথ, এই কোটবাড়ি বিশ্বরোড চৌরাস্তা হয়ে উঠতে যাচ্ছিল এক নতুন আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। আন্দোলন নেতৃত্ব দিচ্ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, তবে তার চেয়ে বড় বিস্ময় ছিল স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বার্তার মতো করে ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, ১৮ তারিখ শাটডাউন হবে। কোটবাড়ি চৌরাস্তায় সবাই থাকবে। এ যেন কোনো সাধারণ আন্দোলনের প্রস্তুতি নয়, এ যেন এক মহা যুদ্ধযাত্রা। শুধু পার্থক্য ছিল অস্ত্রে শিক্ষার্থীরা হাতে নিয়েছিল পাথর, ইটের কঙ্কর, কলমের সেøøাগান আর বুকভরা সাহস। অন্য দিকে পুলিশের অস্বস্তি ও প্রশাসনের উৎকণ্ঠা বাড়ছিল। সরকার জানত, ২০১৮ সালে যে আন্দোলন তাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, এবার তার চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে যাচ্ছে। তাই আগেই পাঠানো হয়েছিল পুলিশ ও বিজিবির একাধিক ইউনিট। একজন ছাত্র লিখেছিল তার ডায়েরিতে, কাল যদি গুলি লাগে, যদি শহীদ হয়ে যাই, আমার লাশটা যেন কোটবাড়িতেই পড়ে থাকে। যেন কেউ দেখে বুঝে যায় এখানে একজন ছাত্র শহীদ হয়েছে তার প্রজন্মের অধিকার রক্ষার জন্য।” সেদিন সূর্য উঠেছিল প্রতিদিনের মতোই, কিন্তু বাতাস ছিল ভিন্ন। আকাশে ছিল একটা চাপা অস্থিরতা, যেন প্রকৃতিও জানত, আজ বাংলাদেশে কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রক্তে লেখা থাকবে। ভোর ৫টা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও মেসগুলোতে ঘুমিয়ে থাকা চোখগুলো ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। কেউ ফজরের নামাজ পড়ে, কেউ চোখে পানি দিয়ে রেডি হয়, কেউ ব্যাগে পাথর, পানি, প্রয়োজনী ওষুধ, গ্যাস লাইট আর হালকা নাশতা ভরে নেয়। তাদের চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্থিরতা যেন তারা জানে আজ তারা লড়বে। জয়-পরাজয় কিছু নয়, মুখ থুবড়ে না পড়ে দাঁড়িয়ে থাকার নামই হবে বিজয়।

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য ১৮ জুলাই সারা বাংলাদেশে ‘কমপ্লিট শাট ডাউন’-এর ঘোষণা দিলে সারা বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো আমাদের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও সাড়া দেয়। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা কোটবাড়ি বিশ্বরোডে জমা হয়ে বিশ্বরোড অবরোধ করলে কোটবাড়ি বিশ্বরোডের চৌরাস্তার পূর্ব পাশে পুলিশ ও বিজিবি অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ১২টা থেকে আসরের পর পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় বিকেল ৬টা পর্যন্ত বুলেট, রাবার বুলেট, ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করতেই থাকে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের স্কুল, কলেজের অনেক শিক্ষার্থী আহত হয় এবং একজন কলেজ শিক্ষার্থী শহীদ হন। আহতের সংখ্যা সঠিক বলতে পারছি না তবে ধারণা করছি ৫০০ থেকে এক হাজার জন আহত হয়। তবে প্রায় পাঁচ থেকে ১০ হাজার শিক্ষার্থী যারা ওই দিন আন্দোলনে ছিল কিন্তু কাঁদুনে গ্যাসে অসুস্থ হয়নি এমন কাউকে পাওয়া যাবে না।

কোটবাড়ি বিশ্বরোডের আশপাশের মানুষের আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতো ছিল। ওইদিন যে যেভাবে পারে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। কেউ পানি দিয়ে, কেউ বিস্কুট ও খাবার দিয়ে, লাঠি দিয়ে, অসুস্থদের সেবা যত্ন ও ওষুধ দিয়ে সাহায্য করেছে। মানুষ এমনভাবে সাহায্য করেছে, এ যেন আরেক মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৫২, ৬৯ সালে ছাত্র আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানুষ একজন আরেকজনকে কিভাবে সাহায্য করেছে দেখি নাই। কিন্তু আমি ২০২৪ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সরাসরি দেখেছি। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বইয়ে পড়েছি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় কোনো মুক্তিযোদ্ধা খাবারের জন্য কষ্ট পাইনি। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যে যেভাবে পারে সাহায্য করেছিল। প্রয়োজনে নিজের খাবার না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াই ছিল। শুনেছি বাংলার মানুষ কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছে তবে তা বাস্তবে দেখেছি ১৮ জুলাই ২০২৪ সালে।

আন্দোলনে যারা ছিল প্রায় সবাই অসুস্থ হয়েছে তবে কেউ হাল ছেড়ে দেননি। বিশেষ করে স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের অবদান ভুলে যাওয়ার মতো না। পুলিশ ও বিজিবি অনবরত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা আক্রমণ করার পর শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠতে না পেরে হতাশ হয়ে বিজিবি সাদা পতাকা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণ করার আগে পুলিশ পালিয়ে যায়। বিজিবি ছিল, তাদের নিয়ে স্লোগান দিয়ে কোটবাড়ি বিশ্বরোড মাতিয়ে রাখা হয়। তারা আত্মসমর্পণ কখনোই করত না যদি তাদের জীবনের বেঁচে থাকার মায়া না থাকত। তারা মৃত্যুর কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। কারণ কোটবাড়ি বিশ্বরোডের চার রাস্তার পূর্ব পাশে তারা দাঁড়িয়ে আক্রমণ করেছিল। তারা আক্রমণ করলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে তিন দিকে ছড়িয়ে যায়। আর ইটের কঙ্কর নিক্ষেপ করতে থাকেন। পরে চার দিক থেকে আক্রমণ করে তাদের কয়েকটি গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুর করলে তারা সাদা পতাকা দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। আমি সকালে কিছু না খেয়ে আন্দোলনে যোগদান করি। তবে কোটবাড়ি বিশ্বরোডে গিয়ে একটা বন আর পানি খেয়ে রাস্তায় ওঠার একটু পর পুলিশ ও বিজিবি গুলি করে। আমার সাথে পকেটে করে নিয়ে যাওয়া কয়েকটি পাথর ছিল, ওইগুলো নিক্ষেপ করার পর হাতের কাছে কিছু না পেয়ে আশপাশে কিছু খুঁজে ইট বের করে কঙ্কর করে নিক্ষেপ করতে শুরু করি।

তবে স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরাই এই ১৮ তারিখের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সাহসিকতার পরিচয় দেন। কোনো সন্দেহ ছাড়া এক বাক্যে বলতে হয় তারা অসীম সাহসী এক একটা আগুনের গোলা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন কিন্তু স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাই যুদ্ধ করেছেন ও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এটাও বলতে চাই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়নি, ভাঙচুরও করেনি। শিক্ষার্থীরা আসরের নামাজের পর বা আত্মসমর্পণের পর এক বিজিবিকে হাতে হাত ধরে স্লোগান দিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলতে থাকেন। বাকিরা তার পাশে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। এই যে আত্মসমর্পণের পর বা শিক্ষার্থীদের বিজয় মিছিলে এক বিজিবি নিয়ে মিছিল এবং স্লোগান দেয়ার ভিডিওটি সারা বাংলাদেশে এবং বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। এটিই ছিল সেই দিনের নিঃশব্দ ইতিহাস যা চোখে জল এনে দেয়, বুকে আগুন জ্বালায়, আর মনে করিয়ে দেয় স্বপ্নের বাংলাদেশ একদিন আসবেই। তবে তার জন্য এমন শহীদদের ত্যাগ কখনোই ভুলে যাওয়া চলবে না।