কমতে পারে নিত্যপণ্য থেকে প্রযুক্তিপণ্যের দাম

দাম কমবে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে একদিকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, অন্য দিকে জনস্বার্থ, কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব খাতকে উৎসাহিত করতে শতাধিক পণ্য ও সেবায় কর-শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। গতকাল বাজেট প্রস্তাবে বিশেষভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, চিকিৎসাসামগ্রী, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, বৈদ্যুতিক যানবাহন, মসলা, খেজুর এবং শিল্পের কাঁচামালের ওপর কর-শুল্ক কমানোর কথা বলা হয়েছে। ফলে এসব খাতে মূল্যহ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

নিত্যপণ্যে স্বস্তি দিতে উৎসে কর কমানো : উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা এসেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজসহ কৃষিভিত্তিক ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এসব পণ্যের ওপর পণ্যভেদে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর রয়েছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে ব্যবসায়ীদের করের চাপ কমবে এবং বাজারে সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়ও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।

খেজুর ও মসলার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব : খেজুর আমদানির ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের ব্যয় কমবে এবং বাজারে খেজুরের দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচসহ সব ধরনের আমদানিনির্ভর মসলার ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ : কৃষি খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করতে সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিদ্যমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে জিংক সালফেট সার উৎপাদনের কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানিতে শুল্কহার শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

কীটনাশক উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার এবং আমদানিকৃত কীটনাশকের ওপর অগ্রিম কর মওকুফের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে।

পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতেও সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এসব খাতের খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালকে শূন্য শুল্ক সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পোলট্রি ও ডেইরি খাতের যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক শূন্য শতাংশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শিশুখাদ্যে কমতে পারে উৎপাদন ব্যয় : শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে দেশীয় উৎপাদকদের ব্যয় কমবে এবং বাজারে শিশুখাদ্যের মূল্যও কমতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের স্বস্তির সম্ভাবনা : স্বাস্থ্য খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে।

হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর অগ্রিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রয়েছে। এছাড়া হার্টের রিং বা স্টেন্ট সরবরাহের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি স্টেন্টের মূল্য প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। চোখের ছানি অপারেশনে ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি লেন্সের দাম প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।

ওষুধ শিল্পে কাঁচামালে করছাড় : দেশে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে ক্যান্সারবিরোধী ওষুধ উৎপাদনের ৯টি নতুন কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে এপিআই উৎপাদনের ৫১টি নতুন কাঁচামালের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ওষুধ শিল্পের আরো ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে শূন্য শুল্ক সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ওষুধ শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তারাও এর সুফল পেতে পারেন।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় প্রণোদনা : ডিজিটাল অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার মনিটর এবং প্রিন্টার আমদানির ক্ষেত্রে প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া কম্পিউটারের এসএসডির ওপর বিদ্যমান বেশির ভাগ কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। সার্ভার আমদানিতেও শুল্ক-কর অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ ব্যয় কমবে এবং প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ এবং অগ্রিম কর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইলেকট্রিক গাড়িতে বড় করছাড় : পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইলেকট্রিক গাড়ির মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভি গাড়ির ক্ষেত্রেও করভার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হচ্ছে।

১৮০০ সিসি পর্যন্ত প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির করভারও কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর বিদ্যমান প্রায় ৪০ শতাংশ করভার সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সংস্কৃতি ও সৃজনশীল খাতে সুবিধা : মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট এবং এর যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের দাম কমতে পারে। এ ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক উদ্যোগ : বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বাধীন চলাচল নিশ্চিত করতে ২১ ধরনের সহায়ক যন্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এসব যন্ত্রপাতি আরো সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হতে পারে।