অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বিশে^র বিভিন্ন দেশের মতো বাংলোদেশের পুঁজিবাজারও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিয়েছে। যদিও যুদ্ধ এখনো চলমান এবং আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে, তাই বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কের পরিবর্তে সতর্ক আচরণের পরামর্শ দিয়েছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, সংবেদনশীল হওয়ার কারণে বিশে^র যেকোনো নেতিবাচক ঘটনা বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু ধৈর্য ও মেধা খাটিয়ে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিকল্প নেই। যে কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে এভাবেই বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পুঁজিকে নিরাপদ রাখতে পারেন।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ মন্দায় ভুগতে থাকা দেশের পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী কমবেশী আশার আলো দেখা যাচ্ছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকটির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। কিন্তু এরি মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে সারা বিশে^র পুঁজিবাজারে। একইভাবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও এর প্রভাব পড়ে। ১ মার্চ ঢাকা শেয়ারবাজারের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি দিনের শুরুতেই প্রায় ২৫০ পয়েন্ট হারিয়ে বসে। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার (সিএসই) হারায় সার্বিক মূল্যসূচকের প্রায় সাড়ে ৪০০ পয়েন্ট। যদিও দিনের শেষভাগে এসে বাজারগুলো হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পায়। কিন্তু বাজারে যুদ্ধের যে ধাক্কা লাগে তার রেশ সহজে থামেনি। ৬ মার্চ আবারো বড় দরপতনের শিকার হয় পুঁজিবাজারগুলো। এদিন ডিএসই ২০৮ পয়েন্ট ও সিএসই ৩২০ পয়েন্ট হারায়। তবে দুইবার বড় ধরনের পতনের পরপর আবারো স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। ঈদের ছুটির পর প্রথমদিন বাজারগুলো বড় ধরনের সূচক হারালেও পরদিন তার একটি অংশ আবার ফিরে পায় দুই বাজার।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই যুদ্ধের প্রভাব সামনের দিনগুলোতে দেশের পুঁজিবাজারকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর সাবেক একজন পরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, মধ্য প্রাচ্য যুদ্ধের প্রাথমিক যে ধাক্কা তা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বিশ^ পুঁজিবাজার। এশিয়ারও বেশ কিছু পুঁজিবাজার ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। যদিও এ যুদ্ধ আরো দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমাদের বাজারের সাথেই থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এ সময়টিতে খুবই ধৈর্য ও মেধা খাটিয়ে বিনিয়োগে থাকতে হবে। কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। আবারো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে পুঁজিবাজার। কিন্তু আতঙ্কিত হয়ে লোকসান দিয়ে শেয়ার বিক্রি করতে থাকলে দ্রুতই নিঃশে^ষ হয়ে যাবে কষ্টার্জিত পুঁজি। তই পরিস্থিতি ভালো হওয়ার সময় পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, যুদ্ধাবস্থায় বিনিয়োগকারীদের কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে বিনিয়োগ করা চলবে না। অপেক্ষাকৃত কম মূল্যস্তরে থাকা ভালো কোম্পানিতেই সবার বিনিয়োগ সীমিত রাখতে হবে যাতে অন্তত বছর শেষে অ্যাকাউন্টে ভালো লভ্যাংশ জমা হয়। এ ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানি, ভালো ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি আগামী জুন মাসে অর্থবছর শেষ হতে যাওয়া মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকেই পছন্দের তালিকায় রাখতে হবে যাতে বছরশেষে লভ্যাংশ আয়ের পাশাপািশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে মূলধন ফিরে পাওয়া সহজ হয়।
আগামী দিনগুলোতে বাজার পরিস্থিতি নিতে জানতে চাইলে পুবালি ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আহসান উল্যা নয়া দিগন্তকে বলেন, শেষ কার্যদিবসে বাজার ভালো ছিল। সূচকের উন্নতির পাশাপাশি লেনদেনও ভালো ছিল। এটা প্রমাণ করে সামনের দিনগুলোতে বাজার ভালো পারফর্ম করবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ খুব সহজে থামবে বলে মনে হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে কোনো অবস্থায়ই আতঙ্কিত হয়ে পুঁজি নষ্ট করা যাবে না। তিনি মনে করেন, এ সময় বাজারে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে বাজার পর্যবেক্ষণে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর যারা বিনিয়োগ করতে চান তাদের উচিত হবে ভালো কোম্পানিতে থাকা যাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর ২০২০ সালের করোনা সংক্রমণের সময় আবারো বড় বিপর্যয়ে মুখে পড়ে বিশে^র পুঁজিবাজারগুলো। মাসের পর মাস চলতে থাকে বাজারের সূচক পতনের ধারাবাহিকতা। একপর্যায়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে পুঁজিবাজারগুলো। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটতে না ঘটতেই ২০২২ সালের প্রথমদিকে শুরু রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ। আবারো দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় শুরু হয় বাজারে। বছরেরও বেশি সময়ধরে এর রেশ টানতে হয় দেশের পুঁজিবাজারকে। একপর্যায়ে ধারাবাহিক দরপতন থামাতে তৎকালীন পুুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক কমিশন বিএসইসি লেনদেনে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে। এর মধ্যেই ধুঁকতে থাকে পুঁজিবাজার। পরবর্তীতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটলে তুলে নেয়া হয় ফ্লোর প্রাইস।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাময়িকভাবে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও ব্যাংকিং খাতের অব্যস্থাপনাসহ নানা কারণে অর্থনীতি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ে। এরই অংশ হিসেবে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে মুলধন শূন্য ঘোষণা করে একটি ব্যাংকে একীভূত করা হলে পুঁজিবাজারে তার বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেয়ার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ দুই সিদ্ধান্তেই হাজারো বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজির একটি বড় অংশ হারিয়ে বসে। গত মাসে নতুন সরকার গঠনের পর পুঁজিবাজার যখন কিছুটা আশার আলো দেখতে শুরু করে তখনই শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। তাই বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সামনে আবারো কঠিন পরীক্ষা।


