প্রথম এক মাসের খতিয়ান

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি

নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এক মাস অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদে’র মতো একটি রাজনৈতিকভাবে মীমাংসিত ইস্যুকে আদালতে নিয়ে যাওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

আলমগীর কবির
Printed Edition

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর এক মাস অতিবাহিত হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদে’র মতো একটি রাজনৈতিকভাবে মীমাংসিত ইস্যুকে আদালতে নিয়ে যাওয়ায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান গত ১০ মার্চ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, বর্তমান সরকার জনগণের কল্যাণ, মানবাধিকার এবং নারীর অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় জাতীয় পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু কর্মসূচি চালু করা হয়েছে এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বেআইনি গ্রেফতার ও মামলা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারের এই পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হিসেবে দেখা দিলেও জুলাই সনদকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, তড়িঘড়ি করে দু’জন আইনজীবীর মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যে রিট দায়ের করা হয়েছে, তার পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে। তিনি মনে করেন, সরকারের কিছু ব্যক্তি বিষয়টি আদালতে ‘সাবজুডিস ম্যাটার’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে সংসদকে যেন কোনোভাবে বাধিত করা না যায়, সেই কৌশল অবলম্বন করেছেন। গত ৩ মার্চ দু’টি রিট পিটিশনের শুনানি হয়েছে, যেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং সংবিধান সংস্কার সভা গঠনকে অসাংবিধানিক ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।

শিশির মনির প্রশ্ন তোলেন, এই আদেশটি গত নভেম্বর মাসে জারি হলেও কেন ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে রিট করা হলো না এবং কেন সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো না।

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে একই ব্যালটে অনুষ্ঠিত হলেও কেবল গণভোট অংশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, যা তার মতে ‘ক্যালকুলেটিভ ও পলিটিক্যালি মোটিভেটেড’।

তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের সব চেষ্টা ‘বুমেরাং’ হয়েছে। রাজনৈতিক দলের আলোচনার ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরতে হলে আলোচনার মাধ্যমেই সরতে হবে। বিপ্লবের চেতনাকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে আদালতের ওপর দায় চাপানোর এই মানসিকতা রাজনৈতিক ও আইনগত ভুল হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

একই বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোট নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের সমাধান সংবিধানে নেই, বরং এর সমাধান নিহিত রয়েছে সরকারের জারি করা আদেশ এবং জনগণের দেয়া মতামতের মধ্যে। তিনি ‘ডকট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন’ ধারণার অবতারণা করে বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐকমত্যের বিষয়গুলো আদালতের এখতিয়ারের বাইরে থাকা উচিত। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরির পেছনে কার লাভ হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, শুরু থেকেই বিভক্তি ও অনৈক্য সৃষ্টি করা হলে তা দেশের জন্য জটিলতা তৈরি করবে এবং শেষ পর্যন্ত পলাতক শক্তির ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করতে পারে, যা হবে আত্মঘাতী।