রফিকুল হায়দার ফরহাদ, কানাডা থেকে
৩ জুলাই মরক্কোর কাছে হারের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে এবারের বিশ্বকাপে কানাডার মিশন। আর ৫ জুলাই ভ্যাঙ্কুভারে কলম্বিয়া-সুইজারল্যান্ড ম্যাচের মাধ্যমে ইতি টানা হয়ে গেছে চলমান বিশ্বকাপের কো-হোস্ট কানাডার পর্ব। এখন প্রশ্ন, বিশ্বকাপ শেষেও কি কানাডায় এই ফুটবল জনপ্রিয়তা থাকবে। উত্তর আমেরিকার এই দেশটি একটি ফুটবল-লাভিং দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। এক সপ্তাহ কানাডার টরেন্টোর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে এই বিষয়ে প্রবলভাবেই আশাবাদী হওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যেখানে ফুটবল গ্রাউন্ড কমই চোখে পড়েছে, সেখানে একেবারেই ব্যতিক্রম কানাডার টরেন্টো। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফুটবল মাঠ। একটি দু’টি নয়। এক সাথে তিন-চারটি ফুটবল মাঠ। সেখানে থাকা একাধিক গোল পোস্টই বলে দিচ্ছে এগুলো ফুটবল গ্রাউন্ড।
শুধু মাঠ থাকলেই হবে না। সেখানে ফুটবলের চর্চাও হতে হবে। প্রতিদিন বিকেলে সেই চর্চা হচ্ছে এই মাঠগুলোতে। টরেন্টো শহরের বিশাল অংশজুড়ে ওন্টারিও লেক। এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ভেনু টরেন্টোর বিএমও স্টেডিয়াম এই ওন্টারিও লেকের পাশেই। প্রথমে এই লেককে আটলান্টিক মহাসাগরের অংশ ভেবে ভুলই করেছিলাম। আসলে এই লেক এত বড় যে প্রথম দর্শনে যে কেউ-ই বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে। টরেন্টোর ডানফোর্ড থেকে সেই ওন্টারিও লেকের লাফার্জ পার্ক পাড়ে যাওয়ার সময় দেখা মিলল বেশ কয়েকটি ফুটবল গ্রাউন্ডের। সেখানে ফুটবল খেলছে কিশোর-তরুণরা। এরা সখের বশের ফুটবলার নয়। ক্লাবের খেলোয়াড়। কোচিং স্টাফসহ সবকিছুই বিদ্যমান। অন্য সব সুযোগ সুবিধাও অত্যাধুনিক। শুধু ওই ফুটবল মাঠগুলোতেই নয়। ওন্টারিও লেকের পাশে যে বিশাল পার্ক সেখানেও খোলা জায়গায় ফুটবল খেলতে দেখা গেছে কিশোরদের। আবার এক জায়গায় বেশ কয়েকটি টেনিস কোর্ট দেখা গেল। এর কিছু দূরে বেসবল খেলার মাঠ। সেখানে বেসবল খেলছেন স্থানীয়রা।
কানাডার ফুটবলের উর্বরভূমি টরেন্টো। এই শহরের ক্লাব টরেন্টো এফসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগে খেলে। কনকাকাফ অঞ্চলের এই দেশে টরেন্টোতেই ফুটবলের জনপ্রিয়তা। আর এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল এই খেলার গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করছেন এশিয়ানরা। সাথে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীরাও। তবে এদের পেছনে বড় ভূমিকা পর্তুগালের লোকজন। টরেন্টোতে প্রায় দুই লাখ পর্তুগালের নাগরিক থাকে। এরা ভবন নির্মাণ শিল্পে সম্পৃক্ত। স্থানীয় বাংলাদেশী আরিফুর রহমান মিলন জানান, এই পর্তুগীজরা তাদের দেশের বিশ্বখ্যাত ফুটবলা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে জনপ্রিয় করেছে এই দেশে।
সে সাথে রোনালদোর গোল উৎযাপন এবং খেলার স্ট্রাইল সবই উঠতি ছেলে মেয়েদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই টরেন্টোর মাঠে রোনালদো তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শেষ গোল করেছেন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জিতেছে সেই দিন। সে দিন প্রচুর কানাডিয়ানের গায়ে দেখা গেছে রোনালদোর জার্সি। তাদের সাথে সাথে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের গায়েও ছিল রোলানদোর জার্সি।
রোনালদোর পর্তুগাল কানাডায় সেরা ৩২-এর ম্যাচ জিতে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে সেখানে সেরা ১৬-এর ম্যাচ খেলেছিল। সেই ম্যাচে যখন হারলো স্পেনের কাছে, তখন দেখা গেছে স্থানীয় ১০-১২ বছর বয়সী ছেলেদের কাঁদতে।
কাডানা-প্রবাসী বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলাবাসীর পিকনিক ছিল টরেন্টোর পাশের এলিস্টনের আলরো প্রভেন্সিয়াল পার্কে। তখন চলছিল কানাডা ও মরক্কোর সেরা ১৬-এর ম্যাচ। তখন পিকনিকে আনন্দ করা রেখে সাত-আট কিশোর মোবাইলে বিশ্বকাপ খেলা দেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। বাংলাদেশী প্রবাসী ফারজানা মুন্নী জানান, ‘আগে থেকেই টরেন্টোতে ফুটবল জনপ্রিয় ছিল। তবে এবার বিশ্বকাপের কারণে এই জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। একে তো কানাডার নকআউট পর্বে ওঠা। তার ওপর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উপস্থিতি। আমার ছেলেও এখন ফুটবলার হতে চায়। তাকে রোনলাদোর জার্সি কিনে দিতে হয়েছে।’ আরেক প্রবাসী রুমানার ছেলে আবরারও প্রচণ্ড ভক্ত রোনালদোর। আবরারের স্কুলের পাশেই ছিল রোনালদোদের প্র্যাকটিস ভেনু। ছোট্ট ছেলে আবরার রোনলদোর পর্তুগালের প্র্যাকটিস ভেনুর পাশে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে এরপর রোনালদোর বহনকারী গাড়ি দেখে বাড়ি ফিরেছে। -জানালেন রুমানা।
টরেন্টোর ডেন্টোনিয়া পার্কে অবস্থিত বিশাল খোলা মাঠ। সেখানে দেখা গেল বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়েরা ফুটবল খেলছে। এটি বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা হলেও এখানে থাকা ফুটবল গ্রাউন্ডে নানা দেশের উঠতি ফুটবলাররা খেলতে আসে। তারা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে খেলছে। প্রবাসী বাংলাদেশী আদনান জানান, কানাডা ২০২২ সালেও বিশ্বকাপ খেলেছে। তবে এবার তাদের অংশগ্রহণ স্বাগতিক হিসেবে। এতে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে স্থানীয় কিশোর-তরুণদের মধ্যে। এই যে দেখুন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ছাড়া তরুণরাও ফুটবল খেলছে। কাবির নামের অপর বাংলাদেশীর মতে, এবারে বিভিন্ন স্থানে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখানো হয়েছে ফ্যান জোন করে। এতে আমাদের মতো বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরা ছাড়াও স্থানীয় কানাডিয়ানরাও সেই ফ্যান জোনে খেলা দেখেছে। এটি কিন্তু ইতিবাচক দিক। অপর দুই প্রবাসী ঈশান ও অদিত্য সাহা জানান, এখন এখানে হাইপ তৈরি হয়েছে। ফুটবলের সাথে সবার অংশগ্রহণ বেড়েছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের মধ্যেও শুরু হয়েছে ফুটবল চর্চা।



