বাংলা নববর্ষের আগমনী বার্তা এখনো পুরো শহরজুড়ে ছড়িয়ে না পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের আঙিনায় ইতোমধ্যে লেগেছে উৎসবের ছোঁয়া। পয়লা বৈশাখকে বরণ করে নিতে সেখানে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা। তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলছে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পুরো আয়োজন শেষ হবে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এই শোভাযাত্রা, যা প্রতি বছর ঢাবির চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। সময়ের পরিবর্তনে এর নামে পরিবর্তন এলেও মূল চেতনা ও উৎসবের আবহ রয়ে গেছে অটুট। এ বছর শোভাযাত্রার নাম রাখা হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ এবং এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে শুধু উৎসব নয়; বরং সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
গতকাল চারুকলা অনুষদে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকা যেন এক শিল্পকর্মের কর্মশালায় পরিণত হয়েছে। দেয়ালজুড়ে আঁকা হচ্ছে গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির চিত্র, যা বাঙালির ঐতিহ্য ও শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। চারুকলা অনুষদের প্রবেশমুখে জয়নুল গ্যালারির সামনে দেখা যায় মাটির সরায় আল্পনা আঁকার কাজ চলছে। পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মুখোশ, যেখানে ফুটে উঠছে বাঘ, পেঁচা, গ্রামীণ জীবনচিত্রসহ নানা প্রতীকী উপাদান। এসব শিল্পকর্ম শুধু শোভাযাত্রার অংশই নয়; বরং এগুলো বিক্রির মাধ্যমে আয়োজনে অর্থ সংগ্রহও করা হচ্ছে।
চারুকলা অনুষদের ডিন এবং নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মো: আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, এই আয়োজন কেবল চারুকলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাবির বিভিন্ন বিভাগ, এমনকি দেশের অন্যান্য শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নিচ্ছেন। তাদের আঁকা ও তৈরি করা শিল্পকর্ম বিক্রির মাধ্যমে শোভাযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে, যা এই আয়োজনকে একটি সম্মিলিত উদ্যোগে পরিণত করেছে।
শোভাযাত্রার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এর বিশালাকৃতির প্রতীকী মোটিফগুলো। খোলা প্রাঙ্গণে এগুলোর নির্মাণকাজ চলছে জোরেশোরে। বাঁশ ও বেত দিয়ে কাঠামো তৈরি শেষ হলেও এখনো রঙ ও শৈল্পিক উপস্থাপনার কাজ বাকি রয়েছে। এ বছর শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ নির্ধারণ করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিই বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সমকালীন বার্তাকে প্রতিফলিত করে।
প্রধান মোটিফগুলোর মধ্যে রয়েছে, লাল ঝুঁটির বিশাল মোরগ, যা নতুন সূচনা, জাগরণ এবং অন্ধকার দূর করে আলোর আগমনের প্রতীক। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাল সূর্যের প্রতীক, যা নতুন দিনের আশা এবং গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের আকাক্সক্ষাকে তুলে ধরে। এ ছাড়া রয়েছে দোতারা, যা বাঙালির লোকসঙ্গীতের প্রাণ এবং সাংস্কৃতিক শেকড়ের প্রতিচ্ছবি। এটি একই সাথে বাউলসহ লোকশিল্পীদের অবমূল্যায়নের বিষয়টিও সামনে আনে এবং তাদের যথাযথ মর্যাদা ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের আদলে নির্মিত কাঠের হাতি লোকজ ঐতিহ্য, শক্তি ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে স্থান পেয়েছে। অন্য দিকে টেপা আকৃতির ঘোড়া গ্রামবাংলার সরল জীবনযাপন, শৈশবের স্মৃতি এবং প্রাচীন মৃৎশিল্পের ধারাকে প্রতিনিধিত্ব করে। আর শান্তির পায়রা প্রতীক হয়ে উঠেছে সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং বৈশ্বিক শান্তির প্রত্যাশার, যা পুরো আয়োজনকে একটি মানবিক ও সর্বজনীন বার্তা দেয়।
এই পাঁচটি প্রধান মোটিফের পাশাপাশি শোভাযাত্রায় থাকবে আরো অনেক ছোট ছোট প্রতীকী উপাদান, যা পুরো আয়োজনকে আরো বর্ণিল ও অর্থবহ করে তুলবে। একই সাথে পাঁচটি পটচিত্রে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও লোকজ কাহিনীর বিভিন্ন দিক- বাংলাদেশ, গাজীরপট, আকবর, বনবিবি ও বেহুলা। এসব পটচিত্রে শেষ মুহূর্তের রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন শিল্পীরা।
প্রস্তুতির এই শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা দেখতে চারুকলা প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই আসছেন এই সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ দেখতে। ঢাবি শিক্ষার্থী রাফসান আহমেদ বলেন, প্রতি বছরই এই আয়োজন আমাকে মুগ্ধ করে। বিশেষ করে শোভাযাত্রার আগের সময়ের এই প্রস্তুতি দেখার মধ্যে একধরনের আলাদা আনন্দ ও আবেগ কাজ করে।
এ দিকে শোভাযাত্রাকে আরো প্রাণবন্ত করতে নেয়া হয়েছে নানা আয়োজন। প্রায় ৪০ জন শিল্পীর একটি দল ঢোল, পিতলের বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাবে, যা পুরো পরিবেশকে উৎসবমুখর করে তুলবে। পাশাপাশি জাতীয় পতাকা, রাজা-রানীর মুখোশসহ নানা উপকরণ শোভাযাত্রায় বহন করা হবে, যা ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতীকী উপস্থাপনা হিসেবে কাজ করবে।
নববর্ষের দিন সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি ঘুরে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হবে। এই পথজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বর্ণ, সুর ও আনন্দের এক অপূর্ব সম্মিলন।
নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। পয়লা বৈশাখের দিন ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরে প্রবেশ করা যাবে না এবং ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ থাকবে। তবে চারুকলা অনুষদের তৈরি মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। এ ছাড়া ভুভুজেলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
সব অনুষ্ঠান বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে এবং এর পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। নববর্ষের আগের দিন সন্ধ্যা ৭টার পর ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন ঢুকতে পারবে না। নববর্ষের দিন পুরো ক্যাম্পাসে সবধরনের যান চলাচল, বিশেষ করে মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্যাম্পাসজুড়ে সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে বসিয়ে মনিটরিং করা হবে। এ ছাড়া ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে হেল্প ডেস্ক, কন্ট্রোল রুম এবং অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোবাইল পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পাঁচটি প্রধান প্রতীকের মাধ্যমে এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয়; বরং বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সামাজিক চেতনা এবং সমকালীন বাস্তবতার এক সম্মিলিত প্রতিফলন হয়ে উঠতে যাচ্ছে। এটি যেমন আনন্দের, তেমনি একটি বার্তাবহ আয়োজন, যেখানে নতুন সূচনা, ঐক্য এবং মানবিক মূল্যবোধের আহ্বান প্রতিফলিত হয়েছে।



