হাওরে বিপর্যয় এলেই নড়েচড়ে বসে কৃষি বিভাগ। আগাম ধান কাটার নির্দেশনা, স্বল্পমেয়াদি জাতের প্রচার, যান্ত্রিকীকরণের নানা উদ্যোগ সামনে আসে। কিন্তু সময় গড়াতেই সেই তৎপরতা হয়ে পড়ে ঢিলেঢালা- এমন অভিযোগ বহু বছরের। চলতি মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
দেশের সাতটি হাওর জেলা-সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন একই চিত্র। অধিকাংশ হাওরই পানিতে থইথই করছে; এর নিচে রয়েছে কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। কোথাও কোথাও কৃষক কিছু ধান কাটতে পেরেছেন; কিন্তু রোদ না থাকায় সেই ধানই খলায় পড়ে চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। ক্ষতি কমাতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কাঁচা ধানই সেদ্ধ করছেন।
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর তীরবর্তী প্রায় সব গ্রামের কৃষকের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তথ্য ও কেন্দ্রীয় হিসাবের মধ্যে গরমিল রয়েছে, আবার বেসরকারি সংস্থার তথ্যের সাথেও সরকারি হিসাবের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির নির্ভুল হিসাব না হলে সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত হিসাব তৈরির তাগিদ দিয়েছেন তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের তথ্যানুযায়ী, বৃষ্টি ও ঢলে সাত জেলায় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে। ধান কাটা হয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ, আর পানিতে তলিয়েছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ জমি। তবে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার দাবি, ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর। তাদের হিসাবে এখনো এক লাখ ৩০ হাজার ৮১২ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি এবং প্রায় সবই পানির নিচে রয়েছে।
চলতি মৌসুমে হাওরের সাত জেলায় চার লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এর প্রায় এক-চতুর্থাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। ফলে এবারের ক্ষতি জাতীয় উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে, যদিও কৃষি বিভাগ মনে করছে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধাক্কা না-ও লাগতে পারে।
মাঠের বাস্তবতা : লোকসান, শ্রমিক সঙ্কট ও অনিশ্চয়তা
মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। কিশোরগঞ্জের ইটনা-অষ্টগ্রাম-করিমগঞ্জ এলাকায় অনেক জমির ধান কাটার আগেই তলিয়ে গেছে। কাটা ধান শুকাতে না পারায় অঙ্কুরিত হয়েছে, ফলে বাজারে দাম নেমে এসেছে মণপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়, যেখানে আগে ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না। শ্রমিক সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। আগে ধান কাটার মজুরি ছিল ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, এখন তা বেড়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবুও শ্রমিক মিলছে না।
অতীতের পুনরাবৃত্তি : হাওরের এই পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় মার্চের শেষ দিকে উজানের ঢলে হাওর প্লাবিত হয়ে ধান পাকার আগেই অধিকাংশ জমি তলিয়ে যায় এবং বহু এলাকায় প্রায় সম্পূর্ণ ফসলহানি ঘটে। এরপর ২০২২ সালের মে-জুনে সিলেট ও হাওরাঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়। অনেক স্থানে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ফসলহানির অভিযোগ ওঠে। গবাদিপশুর খাদ্যসঙ্কট, পানিবন্দী জীবন ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি তখন চরম আকার ধারণ করে।
২০২০ ও ২০২১ সালেও আংশিক প্লাবন দেখা গেলেও আগাম ধান কাটার কারণে কিছুটা ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়েছিল।
আগাম উদ্যোগ বনাম বাস্তবতা
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে কৃষি বিভাগ বারবার আগাম ধান কাটার নির্দেশনা, ঝুঁকিপূর্ণ জমিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফসল তোলার পরামর্শ, কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহারের উদ্যোগ এবং স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত সম্প্রসারণের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রস্তুতি পূর্ণতা পায়নি। চলতি বছরেও একই চিত্র-নির্দেশনা থাকলেও আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তনে তা কার্যকর হয়নি।
গবেষণা বলছে, সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর : বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলের মূল সঙ্কট ফসলের সময়কাল ও বন্যার সময়ের অমিল। গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৩৬ বছরে আগাম বন্যায় ১০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ধান নষ্ট হয়েছে। এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাস সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হওয়ায় এপ্রিলের মাঝামাঝির মধ্যে ধান কাটা না গেলে ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, হাওরে বন্যার প্রকোপ মে মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এপ্রিলের শেষভাগে প্রায় ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ আগাম ফসল ঘরে তুলতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমান প্রামাণিকের নেতৃত্বে গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন ব্রি ধান-৮৮, ১০১, ১১৩ ও ১০৫-১৪০ থেকে ১৪৫ দিনে পাকে, যা প্রচলিত ১৬০ দিনের জাতের তুলনায় ১৫-২০ দিন আগে কাটা সম্ভব। তবে ফলন কিছুটা কম হওয়ায় কৃষকেরা এসব জাত গ্রহণে অনীহা দেখান।
ধান বিজ্ঞানী ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, হাওরের জন্য এমন জাত প্রয়োজন, যা কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি কম হয়। পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ-কম্বাইন হারভেস্টার ও রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এ দিকে গতকাল মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু ও কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশীদসহ সংশ্লিষ্টরা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, অতিবৃষ্টিতে বোরো ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের দুর্দশা লাঘবে সরকার তিন মাসের মানবিক সহায়তা কর্মসূচি চালু হয়েছে।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদ (হাজী ইয়াছিন) বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষি রক্ষায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর হাওর অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দিয়ে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সঙ্কট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। টেকসই বাঁধ, আগাম সতর্কতা, জলবায়ু সহনশীল জাত এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রতি বছরই হাওরের কৃষককে এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়ে এই সঙ্কট মোকাবেলা সম্ভব নয়। টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রতি বছরই হাওরের কৃষকদের এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে।



