আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক ধারায় অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে বিএনপি। আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে ২৯৭টির মধ্যে ২০৯ আসনে জয় পেয়ে প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরছে দলটি।
একই সাথে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠছে জামায়াতে ইসলামী, যারা ৬৮টি আসনে জয় পেয়ে নিজেদের ইতিহাসের সেরা ফল করেছে। দীর্ঘদিনের কৌশলগত সহাবস্থান থাকা সত্ত্বেও দুই দলের সম্পর্ক এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক- এটিই নতুন বাস্তবতা।
দু-তিন দিনের মধ্যেই নতুন সরকারের শপথ আয়োজন করা হবে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন সূত্র। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ গতকাল জানিয়েছেন, আজই (গতকাল) রাতের মধ্যে ২৯৭ আসনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। আইনগত জটিলতায় চট্টগ্রামের দু’টি আসনের ফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যেই শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হয়। জানা গেছে, সংসদ সচিবালয়ও শপথ অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত। যদিও শপথ কে পড়াবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক বাংলাদেশ জাসদ ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসন পেয়েছে। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের শরিকরা মিলিয়ে আরো কয়েকটি আসনে জয়ী হয়েছেন। চারটি আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘সংস্কারপক্ষে’ ভোট পড়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে। এর অর্থ জুলাই সনদভুক্ত ৪৮ দফা সংবিধান ও রাষ্ট্রসংস্কার প্রস্তাবে জনসমর্থন মিলেছে- যদিও প্রশ্নপত্র ও প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন
প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় তাদের জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় যাচ্ছে দলটি।
লন্ডনে প্রায় ১৭ বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে নির্বাচনী প্রচারে নামেন তারেক রহমান। মায়ের মৃত্যুর পর দলের পূর্ণ নেতৃত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। আন্দোলনের সময়কার মিত্রদের পাশাপাশি ‘কম-বেশি’ আরো দলকে নিয়ে সরকার পরিচালনার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
দুই দশকেরও বেশি ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। হাসিনার পতন ও নির্বাসন, খালেদা জিয়ার মৃত্যু, এই দুই ঘটনার পর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন তারেক রহমান। ফলে ‘দুই বেগমের রাজনীতি’র যুগের কার্যত অবসান ঘটছে।
নির্বাচনী লড়াই : বিএনপি বনাম জামায়াত
ভোটের আগে যুগপৎ আন্দোলনের কয়েকটি দলের সাথে আসন সমঝোতা করে বিএনপি। অন্য দিকে জামায়াতও নিজেদের ভাবমর্যাদা বদলের চেষ্টা চালায়- নারীর অধিকার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দেয়। এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থীও মনোনয়ন দেয় তারা।
জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান দেশজুড়ে প্রচারে বলেন, ‘সরকার হবে জনগণের, কোনো পরিবার বা দলের নয়।’ তবে নারীনীতিসহ কয়েকটি বক্তব্য নিয়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়।
কেমন হলো ভোট
দেড় বছর আগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। মোটা দাগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বড় কোনো সহিংসতা বা কেন্দ্র বাতিলের ঘটনা ঘটেনি। দলীয় হানাহানিতে ঘটেনি কোনো মৃত্যু।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, বেলা ২টা পর্যন্ত ৩৬ হাজারের বেশি কেন্দ্রে প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পড়ে। শেষ পর্যন্ত ভোটের হার আরো বেড়ে যায়। নির্বাচন কমিশন জানায়, এবারের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ৫৯.৪৪। যদিও গোপালগঞ্জে প্রদত্ত ভোটের হার ৪০ শতাংশের নিচে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণকে ‘ইতিবাচক’ বলেছে। যদিও কয়েকটি আসনে ফল ঘোষণা বিলম্বিত হওয়া এবং ‘অনিয়মের’ অভিযোগ তুলেছে কিছু দল।
অন্তর্বর্তী সরকারের বার্তা
ফল ঘোষণার পর সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি নির্বাচনকে ‘শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের অঙ্গীকার আবারো প্রমাণিত হয়েছে।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা
এই নির্বাচনের ফল কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক মেরুকরণের পুনর্গঠনও নির্দেশ করছে। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়লেও শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের উত্থান সংসদীয় রাজনীতিকে আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলবে বলে বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা।
জুলাই আন্দোলনের পর জন্ম নেয়া নতুন প্রত্যাশা, সংস্কার, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি কতটা সফল হয়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিন দশকের পরিচিত মুখের পরিবর্তে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের আবির্ভাব- এটিই হয়তো ত্রয়োদশ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বার্তা।
ইসির দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন লাভ করে। ওই সময় আওয়ামী লীগ ৬২টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৭টি আসনে বিজয়ী হয়।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়। এদের মধ্যে বিএনপি ২৯১টি আসনে প্রার্থী দিয়ে বিজয়ী ২১১টি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জয় পেল ৬৮টিতে। এনসিপি ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ছয়টি। ২৫৩ আসনে প্রার্থী দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র একটি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩৪টি আসনে প্রার্থিতা দিয়ে দু’টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া ৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে গণ অধিকার পরিষদ (জিওপি) একটি আসন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি পাঁচটি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনে, ১৭টি আসনে প্রার্থী দিয়ে গণসংহতি আন্দোলন একটি আসন এবং ২১টি আসনে প্রার্থী দিয়ে খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। ২৪৯টি আসনের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাতজন জয়ী হয়েছেন। তবে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের গেজেট প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ওই দুই আসনের ফলাফল ও গেজেট স্থগিত রয়েছে।
ভরাডুবিতে ৪২টি দলের মধ্যে হতাশা :
এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫১ দলের মধ্যে ৪২ দল কোনো আসনেই জয়লাভ করতে পারেনি। তাদের চরমভাবে ভরাডুবি হয়েছে এই ভোটযুদ্ধে। অনেক দলই শতাধিক আসনে প্রার্থী দিলেও শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে মাত্র ৯টি রাজনৈতিক দল ও কিছু স্বতন্ত্র সদস্য। বাকি ৪২ দলের জন্য এবারের নির্বাচন হয়ে থাকল হতাশার অধ্যায়।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপি, জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপল্স পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম, বাংলাদেশ কংগ্রেস, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এ বি পার্টি), নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), জনতার দল, আমজনতার দল, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি) ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।



