সংসদ প্রতিবেদক
- হাসিনাকে আয়নাঘরের চেয়ারে ইলেকট্রিক শক দিতে হবে : রানু
- বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি ও দলীয়করণ : জামায়াত এমপি
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেছেন, জুলাইযোদ্ধাদের যেকোনো ধরনের আইনি সুরক্ষা দিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪৫ থেকে নির্বাচিত বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম জুলাইযোদ্ধাদের রাজনৈতিক সুরক্ষার বিষয়ে আইনমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা চান।
আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার জুলাই এবং জুলাইযোদ্ধাদের আইনি কাঠামোর আওতায় এনে সুরক্ষা দিয়েছে, যা রাজনৈতিক সুরক্ষাও বটে। তার বক্তব্য ও আবেগের সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমই একটি রাজনৈতিক দলিল এবং জননীতির অংশ। সরকার কেবল আইনি কাঠামোর মাধ্যমেই সুরক্ষা দিতে পারে। জুলাই চেতনায় বিশ্বাসী বর্তমান সরকার জুলাই এবং জুলাইযোদ্ধাদের সব ধরনের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, যা একই সাথে রাজনৈতিক সুরক্ষাও। মন্ত্রী আরো বলেন, যদি তিনি (সংসদ সদস্য) জুলাইযোদ্ধাদের জন্য আরো কোনো ধরনের সুরক্ষার সুপারিশ করেন, সরকার তা বিবেচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে বক্তব্যকালে জুলাই শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা এবং জামায়াত- মনোনীত সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিলেও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী সংসদে এ ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
হাসিনাকে আয়নাঘরে ইলেকট্রিক শক দিতে হবে : আয়নাঘরে যে চেয়ারে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে তাকে সেই চেয়ারে বসিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়ার দাবি জানিয়েছেন বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানু।
গতকাল স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতাকালে তিনি এ দাবি জানান। রানু বলেন, ২৪ এর জুলাই আন্দোলনে আমাদের ফেনীর ১১ জন জীবন দিয়েছেন। তাদের পরিবার আমি এমপি হওয়ার পর আমার সাথে এসে দেখা করে তারা পুলিশ প্রশাসন এবং আদালতের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে পুলিশ প্রশাসন আসামিদের ধরছে না। আবার ধরলেও আদালত তাদের জামিন দিয়ে দিয়েছেন। তারা আমাকে বলেছে আমরা আপনাদের কাছে কিছু চাই না, আমরা শুধু আমাদের সন্তান হত্যার বিচার চাই। আপনি সংসদে এই কথাটি একটু তুলে ধরবেন।
বিএনপির এ সংসদ সদস্য আরো বলেন, এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন চেয়ারে আওয়ামী লীগের দোসররা বসে আছে তারা সরকারকে সহযোগিতা করছে না। এই দুষ্টচক্রকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে কতটুকু বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারা যাবে ভেবে দেখার সময় হয়েছে।
ব্যাংক লুটেরাদের ক্ষমা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে ব্যাংকের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকের হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার যে প্রস্তাব এবং সঞ্চয়পত্রের ১০ শতাংশ কর কাটার যে প্রস্তাব এই প্রস্তাব আমি প্রত্যাহার করার দাবি জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ব্যাংক লুটেরা-ব্যাংক ডাকাতরা কয়েকটি ব্যাংক গিলে খেয়ে ফেলেছে। তারা গ্রাহকের টাকা লুট করে বিদেশে আরামে আয়েশে জীবন যাপন করছে। আর আজকে গ্রাহকরা চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে পারছেন না। তিনি বলেন, যেসব লুটেরা গ্রাহকের টাকা লুট করেছে তাদের কোনো ক্ষমা নেই, ক্ষমা হতে পারে না। তাদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা তাদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ সময় তিনি বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকির প্রসঙ্গে বলেন, এই সরকারের চার মাস বয়স। বিরোধী দল বলে যে আরেকটি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হোন, বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হোন। আমি উনাদের কাছে বলতে চাই আপনারা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রাখুন প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করুন। আমাদের অনৈক্যের কারণে আবার যদি দানব হাসিনা ফিরে আসে যারা ফেসবুকের প্রোফাইল লাল করেছিলেন তাদের জীবনটা কালো করে ছাড়বে।
সংসদ অধিবেশনের চেয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ গুরুত্বপূর্ণ নয়- মন্ত্রীদের উদ্দেশে স্পিকার : সংসদ অধিবেশন চলাকালে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় যেকোনো কর্মকাণ্ডের চেয়ে সংসদ অধিবেশন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় এবং অন্য সব কাজের ওপর এটি অগ্রাধিকার পাবে।
পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজেট আলোচনার সময় সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা যখন নিজ এলাকার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া বা হাসপাতালের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা উপস্থিত না থাকায় কথাগুলো সরাসরি শোনা হয় না। বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক।
বিরোধীদলীয় নেতার ক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। মন্ত্রীরা যেন যথাসময়ে সংসদে উপস্থিত থাকেন এবং সংসদ সদস্যদের উত্থাপিত সমস্যার প্রতিকারের চেষ্টা করেন, সে বিষয়ে তিনি নির্দেশ দেন। এ ছাড়া অধিবেশন চলাকালে সংসদের ভেতরে ছোট ছোট গ্রুপে আলাপ-আলোচনা না করার জন্যও সদস্যদের সতর্ক করেন স্পিকার।
সংসদে ৩ প্রশ্ন মাসুদের, জবাবে স্পিকার যা বললেন : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য জানতে চেয়েছেন পটুয়াখালী-২ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। একইসাথে সরকারদলীয় দুই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও মামলাসংক্রান্ত আলোচিত বিষয় এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন গুজব নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান তিনি।
গতকাল পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এসব বিষয় উত্থাপন করেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তবে এগুলো পয়েন্ট অব অর্ডারের বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন স্পিকার।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, মির্জা আব্বাস দেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সংসদের অভিজ্ঞ সদস্য। তার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা, শপথ গ্রহণসংক্রান্ত পরিস্থিতি এবং কবে তিনি সংসদে যোগ দিতে পারবেন, সে বিষয়ে সংসদকে অবহিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, সরকারদলীয় দুই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও মামলাসংক্রান্ত যে বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থাও সংসদ সদস্যদের জানা দরকার। তারা সংসদীয় কার্যক্রমে কী ভূমিকা পালন করছেন এবং কবে সংসদে যোগ দেবেন, সে বিষয়েও স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গুজব ও আলোচিত বক্তব্য নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য এবং সর্বশেষ শরিফ ওসমান হাদির বিচারসংক্রান্ত যে আলোচনা ও গুজব ছড়িয়েছে, সে বিষয়েও সংসদকে অবহিত করা প্রয়োজন। আমি এই তিনটি বিষয় সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উত্থাপন করছি।
এ সময় স্পিকার বলেন, মির্জা আব্বাস সংসদ সচিবালয়কে চিঠি দিয়ে তার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তার অবস্থা ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে এবং তিনি সুস্থ হয়ে যথাসময়ে সংসদে যোগ দেবেন।
গুজব প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, কে কী বলেছে বা কার সম্পর্কে কী বোঝানো হয়েছে, এসব নিয়ে জাতীয় সংসদের সময় নষ্ট করা যায় না। আর যেসব বিষয় আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, সেসব বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের পর প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে। কারো সংসদ সদস্যপদ নিয়ে সাংবিধানিক বা আইনি কোনো সিদ্ধান্ত হলে সংসদকে যথাসময়ে তা অবহিত করা হবে।
আদ-দ্বীনের মহিলা মেডিক্যাল কলেজ কেন বন্ধ করা হলো- সংসদে প্রশ্ন : আদ-দ্বীন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সেই হাসপাতালের লাইসেন্স বন্ধ করা হলেও সেখানে থাকা মহিলা মেডিক্যাল কলেজ কেন বন্ধ করা হলো- এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংরক্ষিত আসনের মহিলা সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাহফুজা হান্নান। বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতাকালে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নান আরো বলেন, আদ-দ্বীন মহিলা মেডিক্যাল কলেজে ৩৫০ জন বিদেশী শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাদের একাডেমিক সনদ বাতিল হয়ে যাবে। তারা এখন কোথায় যাবে? তিনি আরো বলেন, দেশে সড়ক-লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত মানুষ মারা যাচ্ছে। আদ-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল করলে সব লাইসেন্সধারীরই লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি ও দলীয়করণ- সংসদে জামায়াত এমপি: প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘বিশাল ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন যশোর-৪ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রসুল। তিনি বলেছেন, বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৮১ শতাংশই ঋণনির্ভর। বর্তমানে দেশের প্রতিটি মানুষের কাঁধে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা চেপে আছে। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান দুটি বাধা হিসেবে ‘দুর্নীতি’ ও ‘দলীয়করণ’কে দায়ী করেছেন তিনি। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, এটি একটি বিশাল ঘাটতি বাজেট। দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে এতে।
বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও দলীয়করণের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম-খুনের সমালোচনা আমরা করছি, কিন্তু সেই ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর এস আলম ব্যাংকগুলো ডাকাতি করে, এক লাখ কোটি টাকা দুর্নীতি করে খালি করে দিয়েছে। সেই ফ্যাসিবাদী দোসরদেরই আবার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে।
স্বাস্থ্য খাতে ৮০ হাজার পদ খালি : স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোকে স্বাগত জানিয়ে জাতীয় সংসদে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা: মোসলেহউদ্দিন ফরিদ বলেছেন, দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৮০ হাজার পদ খালি রয়েছে। একইসাথে জনগণকে চিকিৎসার জন্য নিজেদের পকেট থেকে বছরে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে, যা মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ শতাংশ। তিনি বলেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না; জনবল সঙ্কট, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ, বিকল যন্ত্রপাতি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা দূর না হলে কাক্সিক্ষত উন্নতি হবে না।
বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানো, স্বাস্থ্য উপকরণের কর কমানো এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের শিক্ষাকে বিনামূল্যে করার উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
স্বাস্থ্য খাতের বড় সঙ্কট হিসেবে জনবল সমস্যার কথা তুলে ধরে এমপি ফরিদ বলেন, সরকারের স্বাস্থ্য বাজেট যদি ৬৯ হাজার কোটি টাকা হয়, তাহলে জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।



