শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়

কেউ যেন আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে : প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন  : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, সেবাইত, বিহার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আমরা সবাই মিলে ইনশাআল্লাহ একটি শান্তিময় শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। সবার জন্য আমরা গড়ে তুলবো একটি নিরাপদ রাষ্ট্র, একটি নিরাপদ সমাজ, যা প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাম্য। আমরা আজ সব ধর্মের মানুষ একসাথে বসেছি, এক কাতারে বসেছি, এটি আমাদের বাংলাদেশের আবহমানকালের ঐতিহ্য। কেউ যেন আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে। গতকাল মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধমীয় গুরুদের মাসিক সম্মানী দেয়ার পাইলট প্রকল্প উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর ওসামানি স্মৃতি মিলনায়তনে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, মন্দিরের পুরোহিত, সেবায়েত এবং বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষদের মাসিক সম্মানী দেয়া উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বগুড়ার বায়তুল রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম হোসাইন আহমেদ আবদুল্লাহর হাতে সম্মানীর চেক হস্তান্তরের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী আইপাস ব্যাটন চাপ দেয়ার সাথে সাথে সংশ্লিষ্টদের মোবাইলে চলে যায়।

পাইলট প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি মসজিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ অর্থ থেকে ইমাম পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন তিন হাজার টাকা এবং খাদেম দুই হাজার টাকা করে পাবেন। এ ছাড়া মন্দির, বৌদ্ধ বিহার ও গির্জার জন্য মাসিক আট হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি (পুরোহিত/অধ্যক্ষ/যাজক) পাবেন পাঁচ হাজার টাকা এবং সহকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তি (সেবাইত/উপাধ্যক্ষ/সহকারী পালক) পাবেন তিন হাজার টাকা।

প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো: ইসমাইল জবিউল্লাহ অনুষ্ঠানে সম্মানীর পাশাপাশি উৎসব বোনাস দেয়ারও ঘোষণাও দেন। তিনি জানান, মসজিদে কর্মরতদের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় এক হাজার টাকা করে বছরে দু’বার বোনাস দেয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সারা দেশে মসজিদসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মীয় সামাজিক এবং নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের সময় দেশে প্রথমবারের মতো ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি চালু হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় মসজিদ ভিত্তিক শিশু এবং গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ইমাম মুয়াজ্জিন সাহেবসহ অন্যান্য ধর্মীয় ধর্মগুরুদের জন্য একটি নির্দিষ্ট হারে সম্মানী ভাতা দেয়ার পাশাপাশি আপনাদেরকে আরো যোগ্যতরভাবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য, আরো কিভাবে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে আপনাদের প্রতিভাকে ব্যবহার করা যায় সে পরিকল্পনা তৈরির কাজে হাত দিয়েছে।

পাইলট প্রকল্পটি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুদের সম্মানী ভাতা দেয়ার যে কর্মসূচি বর্তমান সরকার চালু করেছে। এর অধীনে প্রথম পর্যায়ে পাইলটিং স্কিমের আওতায় মোট ৪,৯০৮টি মসজিদ, ৯৯০টি মন্দির এবং ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারে মোট ১৬ হাজার ৯৯২ জন এ মাসিক সম্মানী পাওয়া শুরু করেছেন আজ থেকে। পর্যায়ক্রমিকভাবে ইনশাআল্লাহ সবাইকে এ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য সরকারের এসব অর্থনৈতিক কর্মসূচি উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, নাগরিকদেরকে আথির্কভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।

সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে ধর্মীয় নেতাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আহ্বান রেখে বলেন, আপনারা কেউ মসজিদে কিংবা যার যার ধর্মীয় উপাসনালয়ে দায়িত্ব পাশাপাশি নিজেদেরকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে চাইলে আপনাদের সে উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা করা সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেকটি জেলা এবং উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে একজন ইমাম অথবা একজন খতিব অথবা সে এলাকার ধর্মীয় অন্য কোনো ধর্মের একজন গুরুকে সদস্য হিসেবে রাখার তাদেরকেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ যারা অর্থনৈতিকভাবে হয়ত বা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন তাদের জন্য একটি সম্মানী বা আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিক বৈষম্য দূর করে আমরা সবাই মিলে একটু শান্তিতে একটু ভালোভাবে থাকবো। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা জনগণের কাছে সে রকমই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর ভোটের কালি নখ থেকে মোচনের আগেই আমরা আমাদের সব প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি আলহামদুলিল্লাহ। এজন্য আমি আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া আদায় করি।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের জন্য আমরা ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে এ কার্ড সারা বাংলাদেশে চার কোটি পরিবারের নারীপ্রধানরা প্রত্যেকে পাবেন। আগামী ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ থেকে আমরা ফার্মাস কার্ড বা কৃষক কার্ডের পাইলট প্রজেক্ট চালু করব । আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের খাল খনন কর্মসূচি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। যাতে করে আর কোনো ফ্যাসিবাদ কিংবা তাদের তাঁবেদার অপশক্তি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে না পারে, কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতে না পারে। আজ এ মঞ্চ থেকেও এ রকম একটি কথা বলা হয়েছে যে যারা ধর্মীয় গুরু আপনারা আছেন প্রত্যেকটি ধর্মের তারা স্বাধীনভাবে যাতে কথা বলতে পারেন সে বিষয়ে আলোকপাত হয়েছে আজকে এখানে। আমি বিভিন্ন সময় আমার বক্তব্য একটি কথা বলার চেষ্টা করেছি, একজন রাজনীতিকর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, দেশের নাগরিকদেরকে যদি দুর্বল করে রাখা হয়, তাহলে রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। জন্যই আমাদের ইচ্ছা, আমাদের দর্শন, আমাদের পরিকল্পনা, বাংলাদেশের নাগরিকদেরকে আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ধীরে ধীরে শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলতে চাই যদি আমরা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে চাই।

তিনি বলেন, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি শ্রেণীপেশার মানুষ তথা প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং চালিয়ে যাবে। তবে নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেরও রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি কিছু দায়িত্ববোধ অবশ্যই রয়েছে, যা সম্পর্কে আপনাদের সবাই কমবেশি ধারণা রয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমরা যে যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্র এবং সমাজের প্রতি যদি সঠিক দায়িত্বটি পালন করি আমি এ দেশের নাগরিক হিসেবে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দ্রুততম সময়ের ভিতরে আমরা রাজনৈতিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি সুন্দর স্বনির্ভর আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার কাজে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি আখেরাতের কল্যাণের জন্য প্রার্থনার কথা পবিত্র কুরআনুল কারিমে উল্লেখ রয়েছে। ইহকালীন-পরকালীন কল্যাণবিষয়ক নির্দেশনা নিঃসন্দেহে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিধিবিধান অনুযায়ী নির্দেশিত রয়েছে। সুতরাং ধর্মীয় বিধিবিধানের আলোকেই আপনারা আপনাদের শিক্ষাদীক্ষা ও যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতাকে কিভাবে আরো বেশি করে দেশ এবং জনগণের কল্যাণের প্রয়োগ করতে পারেন সে চিন্তা এবং চেষ্টাও অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র মানুষের জীবনে হয়তো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ নিশ্চিত করে। কিন্তু ধৈর্য, সততা, কৃতজ্ঞতা বোধ, শ্রদ্ধা, আনুগত্য, সংহতি, সহনশীলতা, উদারতা বন্ধুত্ব, বিনয়, দায় কিংবা দয়া এ সব বৈশিষ্ট্য অর্জন ছাড়া একজন ব্যক্তি মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না। এ ধরনের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের জন্য ধর্মীয় সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধ উজ্জীবিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে স্বৈরাচারের পতনের পর বিতাড়িত হয়ে যাওয়ার পর এটি সারা দেশে সব শ্রেণী সব বয়সের মানুষের মধ্যে আরো বেশি প্রয়োজন। বিশেষ করে আগামী দিন যারা এ দেশকে নেতৃত্ব দিবে তাদের জন্য আরো বেশি প্রয়োজন। এ ধরনের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের জন্য ধর্মীয় রাজনৈতিক সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সেজন্য একটি ধর্মীয় সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ মানবিক মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের মতন ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীম, বায়তুল মোকাররম মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মহিববুল্লাহিল বাকী, তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, ধর্ম সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদসহ কয়েক জন ধর্মগুরু বক্তব্য রাখেন।