- পরীক্ষা এগিয়ে নিয়েও সুফল মিলছে না
- ফল প্রকাশের বিলম্বে ৩ মাসের ঘাটতি
পরিকল্পনামতো এগোতে পারছে না শিক্ষাপ্রশাসন। বিশেষ করে এলোমেলো শিক্ষাপঞ্জিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একাদশের শিক্ষার্থীরা। ২০২৬ এর এসএসসি পরীক্ষা এবং ফল প্রকাশের বিলম্বে ইতোমধ্যে তিন মাস পিছিয়ে আছে একাদশে ভর্তি ইচ্ছুক আট লাখের বেশি শিক্ষার্থী। একইভাবে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষাও আগের ঘোষণা থেকে আরো দুই মাস পিছিয়ে পরীক্ষার রুটিনও প্রকাশ করা হয়েছে। এ নিয়ে এখন থেকে একাদশের শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে নানা প্রতিবন্ধকতার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে শুধু একাদশে ক্লাস শুরু নয়, শিক্ষাপঞ্জি অনুসরণ করে শিক্ষাকাঠামো ঠিক রাখতে শিক্ষাপ্রশাসন লেজেগোবরে হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ডিসেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও তা নেয়া হয় ২০২৬ সালের এপ্রিলে। এতে ষষ্ঠ শ্রেণীতে চার মাস লেখাপড়া করার পর পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের ওপর প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দেয় শিক্ষার্থীরা। যদিও মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) ডিজি অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল মনে করেন শিক্ষাপঞ্জি যে খুব বেশি এলোমেলো হয়েছে, তা নয়। অতীতে এর চেয়েও বিশৃঙ্খল ছিল। বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় এগোচ্ছে। এ কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সবকিছু শিক্ষাপঞ্জি মেনে শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৬ এর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরপরই বন্যা পরিস্থিতির কারণে এবার এইচএসসি পরীক্ষাও পেছায়। এতে ফল প্রকাশে সময় লাগতে পারে নভেম্বর পর্যন্ত। এ কারণে ৃএবার পিছিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাও। একই সাথে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১৪ মার্চ শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখন থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার পরেও কলেজে ভর্তি কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও জটিলতা বা সময় নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে আগের চেয়ে এবার বোর্ড পরীক্ষা (এসএসসি ও এইচএসসি) কিছুটা এগিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রস্তুতির সময় কমিয়ে পরীক্ষা এগিয়ে আনায় সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে। সেশনজটে পড়লে সেই জটিলতা আরো বাড়বে বলে মনে করেন তারা। তাদের এমন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। অনেক শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষামন্ত্রী এর আগে একাধিকবার বলছেন পরীক্ষা এগিয়ে আনা হবে। পরীক্ষা যদি এগিয়ে আনা হয়, তাহলে ক্লাস শুরুও দ্রুত করা উচিত। যেহেতু দেরিতে ক্লাস শুরু হচ্ছে, সেদিক বিবেচনা করে প্রস্তুতিতে যথেষ্ট সময় দেয়া উচিত হবে। অপর দিকে দেরিতে ক্লাস শুরু করা এবং দ্রুত পরীক্ষা নিয়ে নেয়ার প্রবণতায় শিক্ষার্থীদের বিরাট শিখন ঘাটতি থেকে যাবে বলে মনে করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। তিনি জানান, আমাদের শিক্ষাপ্রশাসনের কর্মকর্তারা পরীক্ষা নেয়ায় বেশি আগ্রহী। শিক্ষার্থীরা কতদিন ক্লাস করল, ক্লাসে কী কী শিখল, তা তাদের কাছে বিবেচ্য হয় খুবই কম। তাদের লক্ষ্য থাকে দ্রুত শিক্ষাবর্ষটা শেষ করা।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান এবার যারা একাদশে ভর্তি হবে, তারা ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। মাঝে প্রায় ২০-২২ মাস সময়। এর মধ্যে পরিকল্পনামাফিক ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া হলে সময় নষ্ট না করে পাঠ শেষ করা সম্ভব হবে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের সামনে লম্বা সময় থাকবে, তারাও সে লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিতে পারবে।
একইভাবে এ বছরের তিন মাস দেরিকে ‘খুব বেশি সমস্যা’ হিসেবে দেখছে না শিক্ষা বোর্ডগুলো। এ বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আমরা ভর্তিপ্রক্রিয়া এগিয়ে এনেছি। ফলে এবার খুব বেশি দেরি হচ্ছে না। যেটুকু দেরি হচ্ছে, তা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। তিনি আরো জানান, ২০২৭ সালে আমরা ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনা করেছি। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৮ সালে এটা কিছুটা এগোতে পারে। ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এগিয়ে এনে ‘সেশন গ্যাপ’ কমানোর কথা বলছেন। অথচ বাস্তবে ঘটছে উল্টো। এবার কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নেই। তারপরও ভর্তি ও ক্লাস শুরু হতে দেরি হচ্ছে। পরীক্ষা নেয়ার ক্ষেত্রে সময় এগিয়ে আনার কথাও বলা হচ্ছে। এতে প্রস্তুতি ঘাটতি থাকবে। খারাপ হতে পারে ফল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাবিদদের মতে ক্রমান্বয়ে সেশনজট কমাতেই নতুনভাবে পরীক্ষা এগিয়ে আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সাল থেকে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটতে শুরু করে। ওই বছর ৮ অক্টোবর একাদশে ক্লাস শুরু করা হয়। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের কারণে ২১ জুলাইয়ের পরিবর্তে ১১ আগস্ট ক্লাস শুরু হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানে এসএসসি পরীক্ষা পেছানোয় ২০২৫ সালেও কিছুটা দেরিতে একাদশে ক্লাস শুরু হয়। সে বছর ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু করা হয় ক্লাস। অথচ এ বছর এসএসসি পরীক্ষা কিছুটা এগোলেও একাদশের ক্লাস শুরু আরো পিছিয়ে যাচ্ছে।



