- ভালো মুনাফা ও লভ্যাংশে ব্যাংক খাতে ফিরছে আস্থা
- বিনিয়োগকারীরা পারফরম্যান্স দেখেই শেয়ার কিনছেন
পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক ও বীমা খাতের দাপটে চাপের মুখে পড়েছে অন্যান্য খাত। দীর্ঘ সময় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের শিকার হলেও সম্প্রতি এ খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানির ভালো মুনাফা ও আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ঘোষণার ফলে আবারো বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বীমা খাতেও। ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে এ দুই খাতের কাছে পিছিয়ে পড়ছে অন্যান্য খাত।
বাজার মূলধনের দিক থেকে পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় খাত ব্যাংক। এর পরেই রয়েছে বীমা খাত। এ দুই খাতের অর্থবছর শেষ হয় ডিসেম্বরে। মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে এসব কোম্পানি বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি লভ্যাংশ ঘোষণা করে থাকে।
এবার ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি দুর্বল কোম্পানি ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান গত কয়েক বছরের তুলনায় ভালো মুনাফা করেছে। একই সাথে ভালো লভ্যাংশও ঘোষণা করেছে। এর তাৎক্ষণিক সুফল পাচ্ছে কোম্পানিগুলো।
দীর্ঘদিন দেশের দুই পুঁজিবাজারে টার্নওভারের শীর্ষ তালিকায় ব্যাংক ও বীমা খাতের কোম্পানির উপস্থিতি কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ দুই খাত লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে। ফলে অন্যান্য খাতের ভালো কোম্পানিগুলোও প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সবসময়ই কিছু ভালো পারফর্ম করা কোম্পানি ছিল। কিন্তু গত দেড় দশকে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার কারণে কিছু দুর্বল ব্যাংকের নেতিবাচক প্রভাব ভালো ব্যাংকগুলোর ওপরও পড়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং দুর্বল ব্যাংকগুলো চিহ্নিত করা হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। কয়েকটি ব্যাংক গত অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করতে সক্ষম হয়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আস্থা সৃষ্টি করেছে।
ভালো পারফর্ম করা ব্যাংকগুলোর ঘোষিত লভ্যাংশও এ খাতে বিনিয়োগ টানছে। অন্য দিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপে বীমা খাতে দীর্ঘদিনের কমিশন বাণিজ্য অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর আয় বাড়তে শুরু করেছে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে শেয়ারদরে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে তা সামনের দিনগুলোতে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক হবে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থবছর শেষ হওয়ায় বর্তমানে ব্যাংক ও বীমা খাতে লভ্যাংশ ঘোষণার সময় চলছে, যার সুফল পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। একইভাবে জুনে অর্থবছর শেষ হলে অন্যান্য খাতেও লভ্যাংশ ঘোষণার সময় আসবে। তখন হয়তো অন্য খাতগুলোর দাপট ফিরে আসতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ভালো পারফরম্যান্স। কারণ বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কোম্পানির কার্যকারিতা, আস্থা ও লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা বিবেচনায় বিনিয়োগ করে থাকেন।
গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের নামমাত্র উন্নতি হয়েছে। বরাবরের মতো এ দিনও সূচকের বড় ধরনের উত্থান দিয়ে লেনদেন শুরু হলেও পরে বিক্রয়চাপে তার বেশির ভাগ হারায় বাজার। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৩০৮ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট থেকে দিনশেষে ৫ হাজার ৩১৭ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে দাঁড়ায়। দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ৩ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১ দশমিক ২৬ পয়েন্ট বেড়েছে।
অন্য দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের আচরণ ছিল মিশ্র। সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩৫ দশমিক ২১ পয়েন্ট বেড়েছে। সিএসসিএক্স সূচক ২২ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট বাড়লেও সিএসই-৩০ সূচক ৬৪ দশমিক ৯০ পয়েন্ট কমেছে।
সূচকের উন্নতি হলেও গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেনে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। ডিএসইতে মোট ৮৮৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ১৩৯ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন ছিল এক হাজার ২৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন ২৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২৪ কোটিতে নেমে এসেছে।
গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক। কোম্পানিটির ৪৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় এক কোটি ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক (এনসিসি ব্যাংক)। কোম্পানিটির ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় এক কোটি ৫০ লাখ ৯৬ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে।
ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলো হলো- শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, লাভেলো আইসক্রিম, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, ব্যাংক এশিয়া, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও সায়হাম কটন মিলস। মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল ইউনাইটেড ফিন্যান্স। কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গতকাল কোম্পানিটি বিগত অর্থবছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে।
দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বিডি থাই ফুডস, যার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলো হলো- এস্কয়্যার নিট কম্পোজিট, আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড, মীর আখতার হোসাইন, রানার অটোমোবাইলস, সায়হাম কটন মিলস, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স।



