একুশে বইমেলার শুরুর ছয় দিন অতিবাহিত হলেও কম দর্শনার্থী সমাগমে প্রত্যাশিত বিক্রি নেই। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি অনেক কম। কারণ এক দিকে রমজান অন্য দিকে এ সময়ের অবহাওয়াও একটু বেমানান। তাই পাঠক-দর্শনার্থী আগ্রহ থাকার পরও মেলায় আসছেন না। তবে আগামী জুমা বারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তারা বিক্রি নিয়ে আশাবাদী।
গতকাল বিকেলে মেলায় গিয়ে দেখা যায় দর্শনার্থী হাতেগোনা। বিশেষ করে ইফতারের আগের সময়টায় মেলা প্রাঙ্গণে ভিড় লক্ষ্য করা যায়নি। এর আগে বিকেল ৩টায় মেলার ফটক খোলা হলেও মানুষের উপস্থিতি ছিল সীমিত। বেশ কিছু স্টলে বিক্রেতাদের বসে থাকতে দেখা যায়। তবে বিকেলের শেষ ভাগে এবং সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।
মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, প্রায় বেশির ভাগ স্টলে অলস সময় পার করছেন বিক্রেতারা। গল্প আড্ডায় সময় কাটানোর সাথে কারো ছিল ইফতারের প্রস্তুতি।
একজন বিক্রেতা জানান, গত শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। বিক্রিও সন্তোষজনক হয়েছে। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন স্টলে ক্রেতাদের ভিড় ছিল বেশি। তবে রোজার কারণে দিনে বিক্রি ও সমাগম কম হচ্ছে।
গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ৬৫টি। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : তাজউদ্দীন আহমদ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহিউদ্দিন আহমদ। আলোচনায় অংশ নেন সাজ্জাদ সিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের কাছে তাজউদ্দীন আহমদ খুবই প্রাসঙ্গিক একটি নাম। তিনি ছিলেন বাংলাশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪০-এর দশকে ঢাকায় মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে একপর্যায়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ইতিহাস আমাদের এমন কিছু সময় ও ঘটনার মুখোমুখি করে, যেটাকে আমরা বলি ক্রান্তিকাল। তাজউদ্দীন আহমদ এমনই একটি সময়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন ১৯৭১ সালে। ওই সময়টি তার এবং সমগ্র জাতির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তাজউদ্দীন আহমদ রাজনীতিতে যত দিন সক্রিয় ছিলেন, তত দিন মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন।
সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, তাজউদ্দীন আহমদ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে চালকের অবস্থানে বসে যুদ্ধের সমন্বয় ও পরিচালনা, সেই সাথে স্বাধীনতা-উত্তর দেশ পুনর্গঠনের চেষ্টা তাজউদ্দীন আহমদকে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ও পরে তার অবদান অনস্বীকার্য। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, তাজউদ্দীন আহমদ যেভাবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পর্যায়ে উঠে এসেছিলেন তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার পরিশীলিত মনোভাব, শিক্ষিত মনন ও ভবিষ্যৎ দূরদৃষ্টিই তাকে নেতা করে তুলেছিল।
লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন আলী আহমদ। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি সাখাওয়াত টিপু। আবৃত্তি পরিবেশন করেন এ কে এম দিদার উদ্দিন এবং অনন্যা লাবণী।
আজ মেলা শুরু হবে বেলা ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : সন্জীদা খাতুন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করবেন ভীষ্মদেব চৌধুরী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে মেলায় ঐতিহ্য প্রকাশনী একাধিক বই নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে নেয়মত ইমাম-এর আয়নাঘর। মূল্য : ৬০০ টাকা। জুলাই বিপ্লবের বহু বছর পর পুরান ঢাকার একটি রেস্টুরেন্টে বাংলা একাডেমির সাতজন সাবেক মহাপরিচালক একটি ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হন। বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি অমরনাথ বৈদ্যকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারটি প্রদান করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেন তারা এবং তাদের নিজস্ব পুরস্কারে ভূষিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সুনির্দিষ্ট দিনে কবির গ্রামের বাড়ি কাঠিবাড়িতে সপ্তম মহাপরিচালকের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে বাকি ছয়জন মহাপরিচালক মোহাম্মদ শফিউল্লা নামক একজন সাংবাদিকের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেন, ঠিক কেন তারা অমরনাথ বৈদ্যকে পুরস্কারটি দিতে পারেননি। তমালিকা কর্মকার নামক একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানা যায়, অমরনাথ বৈদ্য এবং তার মেয়ে মানবিকা বৈদ্য এখন আয়নাঘরে। মহাপরিচালকগণ নিজেদেরকে যেভাবে মোহাম্মদ শফিউল্লার কাছে ব্যাখ্যা করেন, তমালিকা কর্মকার তাদেরকে ব্যাখ্যা করেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তমালিকার ব্যাখ্যায় এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় উঠে আসে যা তারা চান না দেশের মানুষের সামনে প্রকাশিত হোক, যে কারণে মোহাম্মদ শফিউল্লার সাথে তাদের সম্পর্কটি একটি গভীর নিষ্ঠুরতার দিকে ধাবিত হয়।
দেবাশিস চক্রবর্তী এর রক্তাক্ত জুলাই। মূল্য : ৩০০০ টাকা। ‘র.ক্তা.ক্ত জুলাই’ শুধু আর্টের একটি বই-ই নয়; এটি বর্তমানের ভাষ্য আর ভবিষ্যতের দলিল। একাত্তরের পোস্টারগুলো যেমন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে এক কাতারে শামিল করেছিল, চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও এই ডিজিটাল পোস্টার ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংগ্রামী মানুষকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। এই বই যেন দেশে দেশে বিপ্লবী মানুষের এক ইশতেহার ‘রক্তাক্ত জুলাই’।
ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আগস্ট বিপ্লব। মূল্য : ৫৪০ টাকা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে, যা দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসনের অবসানের সূচনা করে। এই ঘটনাকে লেখক ১২০৪ সালে লক্ষ্মণ সেন-এর পলায়নের সাথে তুলনা করেছেন এবং শেখ হাসিনা-এর দেশত্যাগকে ‘দ্বিতীয় ঐতিহাসিক পলায়ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লেখকের দৃষ্টিতে, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই ঘটনাবলির ধারাবাহিকটা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বইটিতে।
এ ছাড়া এসেছে অনুবাদ, মাই স্টোরি। মূল : কমলা দাশ। অনুবাদ : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু। মূল্য : ৩৫০ টাকা। কমলা দাশ ছিলেন ভারতের একজন প্রখ্যাত লেখিকা, যিনি মালয়ালম ও ইংরেজি- উভয় ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন। সাহিত্যপ্রেমী পরিবারে বেড়ে ওঠায় অল্প বয়সেই তিনি কবিতা ও গল্প লেখা শুরু করেন এবং মালয়ালম সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন। সমাজ ও নারীর যৌনতা নিয়ে খোলামেলা লেখার কারণে জীবদ্দশায় তিনি সমালোচিত ও বিতর্কিত হন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ গু ঝঃড়ৎু ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ৬৫ বছর বয়সে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সাহসী লেখনীর মাধ্যমে তিনি ভারতীয় নারীসমাজের মুক্তচিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।



