গ্যাস সঙ্কট ও লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ

উৎপাদন কমছে শিল্পাঞ্চলে রফতানিতে বাড়ছে শঙ্কা

গ্যাস সঙ্কট ও বিদ্যুৎ লোডশেডিং নতুন করে চাপ তৈরি করেছে শিল্প খাতে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, আবার কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা ক্রমবর্ধমান চাপে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, রফতানি আদেশ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশজুড়ে গ্যাস সঙ্কট ও বিদ্যুৎ লোডশেডিং নতুন করে চাপ তৈরি করেছে শিল্প খাতে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, আবার কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ, অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা ক্রমবর্ধমান চাপে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, রফতানি আদেশ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসনির্ভর। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এবং অধিকাংশ শিল্পকারখানার জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। তবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে আসা, নতুন অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধীরগতি এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতার কারণে সরবরাহ ঘাটতি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চ মূল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে।

তথ্যে দেখা যায়, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের অনেক নিচে নেমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক কারখানায় দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া গেলেও চাপ কম থাকায় পূর্ণমাত্রায় বয়লার ও উৎপাদন ইউনিট চালানো যাচ্ছে না। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে দৈনিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফডি)। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২ দশমিক ৬ থেকে ৩ বিলিয়ন ঘনফুট; অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ধীরগতি এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতার কারণে এই ঘাটতি আরো প্রকট হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করাও সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘাটতির বড় কারণ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া এবং আমদানি করা এলএনজির সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকা। ২০১৭ অর্থবছরে যেখানে দেশে গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ৯৭২ বিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৭৪৭ বিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। একই সময়ে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। এ দিকে টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলোতে সঙ্কটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্যাসনির্ভর প্রায় ৪০০টির মতো টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিল বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক মিল ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সিরামিক, সিমেন্ট, ইস্পাত ও কাচ শিল্পেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এসব শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চুল্লি ও বয়লার স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর ফল হিসেবে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং বাড়ছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে মোট সময়ের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করছেন শিল্প মালিকরা। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কাজের সময় নষ্ট হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের অনেক নিচে নেমেছে। অনেক কারখানায় দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস এলেও চাপ এত কম থাকে যে বয়লার ও চুল্লি ঠিকভাবে চালানো যায় না। ফলে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, সিরামিক, ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প মালিকদের হিসাবে, গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানা বর্তমানে মাত্র ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। অনেক কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা গ্যাসের তুলনায় কয়েক গুণ ব্যয়বহুল। জ্বালানি খরচ বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন বিলম্ব, কাঁচামালের অপচয় এবং শ্রমিকদের অলস সময় মিলিয়ে মোট ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে এসব অতিরিক্ত খরচ পণ্যের দামে সমন্বয় করা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, রফতানিমুখী শিল্পগুলোতে এই সঙ্কট নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। শিপমেন্ট বিলম্বিত হওয়ায় বিদেশী ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। বিশেষ করে তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে সময়মতো ডেলিভারি নিশ্চিত করতে না পারলে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। শিল্প মালিকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে কিছু ক্রেতা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তিনি বলেন রফতানি আয় কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। এমনিতেই ডলার সঙ্কটে থাকা অর্থনীতিতে রপ্তানি আয় হ্রাস নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন কমে গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। শিল্প খাতের গতি কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

এমন পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় অতিরিক্ত সময় কাজ বন্ধ হয়েছে, কোথাও শিফট কমানো হয়েছে। এতে শ্রমিকদের আয় কমছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সাময়িকভাবে কিছু ইউনিট বন্ধ রাখা বা শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, জ্বালানি সঙ্কটের দায় যেন শ্রমিকদের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার ও মালিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

দেশের শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট বারবার ফিরে আসবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন তারা। একই সাথে শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নতুন বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার কারণে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারেন। বিদ্যমান শিল্প উদ্যোক্তারাও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারেন। এতে শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি সাময়িক এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এলএনজি আমদানি বাড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শেষ করা এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের মধ্যে গ্যাস বণ্টনে সমন্বয় করার কথাও জানানো হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সঙ্কট ও লোডশেডিং এখন শিল্প খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়া, খরচ বেড়ে যাওয়া এবং রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই সঙ্কট দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে দেশের ব্যসায়িরা মনে করছেন।