নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ব্যর্থ হচ্ছে; মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এমন অভিযোগকে পুরোপুরি একপেশে, পক্ষপাতদুষ্ট এবং কোনো বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল বা আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত বলে দাবি করেছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। একই সাথে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি দেশীয় আইনে পরিচালিত আদালত। ফলে এখানে বিদেশী বিচারক বা আইনজীবী এনে বিচার পরিচালনার কোনো আইনগত সুযোগ বা প্রশ্নই ওঠে না। গতকাল বুধবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এইচআরডব্লিউর আন্তর্জাতিক মান ও প্রক্রিয়ার ওপর তোলা আপত্তির কড়া জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর।
এর আগে, ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) জমা পড়ার পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তোলে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, সংস্থাটি প্রসিকিউশন কিংবা তদন্ত সংস্থার সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ বা বক্তব্য না নিয়েই একপক্ষীয় রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের এই প্রতিবেদনের নেপথ্যে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব থাকতে পারে। এইচআরডব্লিøউর প্রতিনিধিদল যদি প্রসিকিউশন বা তদন্ত সংস্থার সাথে কথা বলে তথ্য যাচাই করত, তবে সঠিক সত্য বেরিয়ে আসত; কিন্তু কোনো আসামির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন কোনোভাবেই নিরপেক্ষ হতে পারে না।
প্রতিবেদনে সাক্ষীদের জবানবন্দীতে একই ধরনের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি নিয়ে সংস্থাটির তোলা প্রশ্ন খারিজ করে প্রসিকিউশন। চিফ প্রসিকিউটর যুক্তি দিয়ে বলেন, একই স্থানে একই ঘটনার মুখোমুখি একাধিক আসামির বিচার হলে সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকাটাই স্বাভাবিক এবং বাঞ্ছনীয়। কারণ এক স্থানে যদি ১০০ জন মানুষ শহীদ হন, তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা ঘটে যাওয়া সেই একই ঘটনার বিবরণই দেবেন। সারা দেশে একই ধরনের অপরাধ, একই প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার ও হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে; ফলে সাক্ষ্যও একই ধারার হবে। এতে দোষের কিছু নেই; বরং সাক্ষীদের বয়ান ভিন্ন ভিন্ন হলে তখনই বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকত, যা এইচআরডব্লিউ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থার মান নিয়ে তোলা প্রশ্ন নাকচ করে আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্ত সংস্থায় অতিরিক্ত আইজিপি, এসপি ও অতিরিক্ত এসপিসহ ২৩ জন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি প্রসিকিউশন টিমে রয়েছেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা। ফলে এই প্যানেলের দক্ষতা বা মান নিয়ে সংশয় প্রকাশের কোনো অবকাশ নেই।
সার্বিক বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর দৃঢ়তার সাথে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ একটি সম্পূর্ণ দেশীয় আইনি কাঠামো। এই আইনি পরিধির মধ্যেই দেশের বিচারক ও আইনজীবীদের মাধ্যমে বিচার সম্পন্ন করা হবে। তিনি উল্টো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কিংবা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো তথ্য যাচাই ছাড়া যে ধরনের প্রতিবেদন দিচ্ছে, তাতে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের নিজেদের নিরপেক্ষতা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আবেদনে জাহিদুল ইসলামের কর্মজীবনের বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, তিনি ২০০০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। প্রায় ১৬ বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অ্যাকাডেমিক কৃতিত্বের জন্য ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ গোল্ড মেডেলও অর্জন করেন।
২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের কথিত ‘জঙ্গিবিরোধী’ অভিযানে নিহত হন জাহিদুল ইসলাম। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের গোপন তথ্য জানার কারণে তাকে পরিকল্পিতভাবে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
সাবেক আইজিপি শহীদুলকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ
এ দিকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হককে আগামী ৩০ জুলাই হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ নির্দেশ দেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি এ মামলায় শহীদুল হকের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারির আবেদন করেন। শুনানি শেষে আবেদন মঞ্জুর করে হাজিরের নির্দেশ দেন আদালত।
এর আগে, ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটরের কাছে একটি আবেদন করেন জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলাম। অভিযোগে নিজের স্বামীকে হত্যার পাশাপাশি তাকে ও তার দুই শিশুসন্তানকে চার মাস সাত দিন গুম করে রাখার কথা তুলে ধরা হয়।
আবেদনে শহীদুল হক ছাড়াও তৎকালীন ডিবি-প্রধান মনিরুল ইসলাম, সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান, তৎকালীন মিরপুর বিভাগের ডিসি মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি শহীদ আলমসহ রূপনগর থানার অজ্ঞাতনামা কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নামে অভিযোগ করা হয়।
জেবুন্নাহার ইসলাম উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ১০টার দিকে তাকে ও তার দুই শিশুসন্তানকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় অভিযুক্তরা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে ও তার স্বামীকে জঙ্গি হিসেবে স্বীকার করতে চাপ দেয়া হয়। স্বীকারোক্তি না দিলে স্বামীর মতো পরিণতি হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়। পরে অভিযুক্তদের একজন তার স্বামীকে তারাই হত্যা করেছে বলে জানান বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, স্বামীকে হত্যার পর তাকে ও দুই সন্তানকে আয়নাঘরে চার মাস সাত দিন গুম করে রাখা হয়। দীর্ঘদিন কোনো স্বীকারোক্তি না পাওয়ায় বড় মেয়েকে আলাদা করে নিয়ে একটি জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার দেখানো হয়। পরে তাকেও আশকোনার একটি বাসা থেকে উদ্ধার দেখিয়ে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ চার বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট তার জামিন বাতিল করে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৩১ আগস্ট পুনরায় জামিনে মুক্তি পান তিনি।



