বন্ড সুবিধায় হাজার কোটি টাকার কারসাজি

শতাধিক রফতানিকারকের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখছে এনবিআর

Printed Edition

শাহ আলম নূর

বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধাকে আড়াল করে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি ও চোরাচালানের মাধ্যমে রফতানি খাতে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে বড় ধরনের নজরদারি শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই অভিযানের অংশ হিসেবে অন্তত ১০০ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের গত পাঁচ বছরের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রাজস্ব বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, কর ফাঁকি এবং ঘোষিত রফতানি আয়ের সাথে প্রকৃত আর্থিক লেনদেনের গরমিল চিহ্নিত করতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিআরের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বন্ড লাইসেন্সের আওতায় আমদানি করা বিপুল পরিমাণ সুতা, কাপড়, টেক্সটাইল কাঁচামাল ও গার্মেন্ট এক্সেসরিজ রফতানিতে ব্যবহারের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছর প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের পণ্য এভাবে দেশের বাজারে প্রবেশ করছে, এতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব এবং স্থানীয় শিল্প পড়ছে চরম অসম প্রতিযোগিতার মুখে।

এই পরিস্থিতিতে এনবিআর দেশের বিভিন্ন কর অঞ্চলকে সন্দেহভাজন রফতানিকারকদের ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০টি কর অঞ্চলের বেশির ভাগই সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও রফতানির পরিসংখ্যানে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে, যাদের ব্যাংক লেনদেন ঘোষিত রফতানি আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় অথবা যাদের উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় রফতানি হিসাব প্রশ্নবিদ্ধ তাদেরই এই নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এনবিআর’র রাজস্ব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে পাওয়া লেনদেনের তথ্য কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম, বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি আয় সংক্রান্ত ডেটাবেজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার তথ্যের সাথে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা ও উত্তোলনের পরিমাণ যদি ঘোষিত রফতানি আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয় এবং সেটির যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ধরে নেয়া হবে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক, পরিচালক, সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবও যাচাইয়ের আওতায় আনার প্রস্তুতি রয়েছে।

এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অনুসন্ধান কেবল কাগজপত্রের অডিটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ব্যাংকিং চ্যানেল, কাস্টমস ডেটা, কাঁচামালের ব্যবহার এবং উৎপাদনের বাস্তব সক্ষমতা সব দিক একসাথে বিশ্লেষণ করা হবে। কোথাও গরমিল ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বন্ড কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে গত ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের ম্যানুয়াল ইউটিলিটি পারমিট বাতিল করেছে এনবিআর। এখন থেকে কাঁচামালের এনটাইটেলমেন্ট, ইউটিলিটি অনুমোদনসহ বন্ড-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বাধ্যতামূলকভাবে কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। রাজস্ব কর্তৃপক্ষের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমস ডেটাবেজের সাথে এই সিস্টেম সংযুক্ত থাকায় ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ও অডিট কার্যক্রম অনেক বেশি কার্যকর হবে এবং আগের মতো ফাঁকি দেয়ার সুযোগ কমে আসবে।

এ বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলছেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আর কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, যে কাঁচামাল ওয়্যারহাউজে থাকার কথা, বাস্তবে সেটি না পাওয়া গেলে ধরে নেয়া হবে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়েছে। এবং সে অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিয়মিত ইনভেন্টরি যাচাইয়ের পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি আরো জোরদার করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

এনবিআর সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে প্রায় ছয় হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। আশির দশক থেকে এই বন্ড ব্যবস্থাই বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে এবং দেশকে বৈশ্বিক রফতানি মানচিত্রে শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে সময়ের সাথে সাথে এই ব্যবস্থার অপব্যবহার বাড়তে থাকায় এখন তা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

দেশীয় টেক্সটাইল মিল মালিকদের অভিযোগ, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ায় তাদের উৎপাদিত পণ্যের সাথে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। যেখানে বৈধ আমদানিতে ৪০ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর দিতে হয়, সেখানে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীরা কার্যত কোনো শুল্ক না দিয়েই বাজার দখল করছে। এর ফলে স্থানীয় মিলগুলো আর্থিক সঙ্কটে পড়ছে, নতুন বিনিয়োগে ভাটা পড়ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সুতা, কাপড় ও পোশাকের চাহিদা থাকলেও স্থানীয় মিলগুলো সরবরাহ করতে পারছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বাকি অংশ মূলত বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারে আসছে, যার ফলে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় বিনিয়োগ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক অস্থিরতা ও মাঠপর্যায়ের নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ায় এই অনিয়ম আরো বেড়েছে। তাদের মতে, বর্তমান অভিযানে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দীর্ঘদিনের অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

একই সাথে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্ড অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি হলেও সৎ রফতানিকারকদের যেন অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ অল্প কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো রফতানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান তদন্তে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি ও জালিয়াতির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জরিমানা, ফৌজদারি মামলা এবং বন্ড লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত বন্ড ব্যবস্থার এই অভিযান শেষ পর্যন্ত অনিয়মের লাগাম টানতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।