২৩৫টি উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ

পৌনে ৫ বছরের কাজ এখন সোয়া ১১ বছরে

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • অর্ধেক কাজ করতেই সোয়া ৮ বছর অতিক্রম
  • খরচ বেড়েছে ৫৩১ কোটি টাকা
  • সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ছিল দুর্বলতা-আইএমইডি

ঢিমেতালে চলছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন। নির্ধারিত সময়ে শেষ তো হচ্ছেই না উল্টো এক যুগকে স্পর্শ করছে বাস্তবায়নকাল। উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ (২য় পর্যায়) (১ম সংশোধিত) প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ ২০২২ সালের জুনে শেষ করার কথা ছিল। অক্টোবর ২০১৭ সালে শুরু হলেও পৌনে ৫ বছরে তা শেষ করতে পারেনি। ৫২ শতাংশ কাজ শেষ করেই ৮ বছর তিন মাস শেষ। ব্যয় বেড়েছে ৫৩১ কোটি টাকা। এখনো নানান জটিলতার জালে প্রকল্পটি। মেয়াদ বাড়তে বাড়তে এখন ১১ বছর ৩ মাসে ঠেকেছে। এই মেয়াদেও শেষ হবে কি না সেটা নিয়ে খোদ পরিকল্পনা কমিশনের সন্দেহ রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প চলাকালে ৪৯টি উপজেলার নকশা ও নান্দনিকতায় পরিবর্তনসহ বেশ কিছু কারণে কাজে বিলম্ব দেখা দেয়। তবে প্রকল্পটির অনুমোদন পেতেও তিন মাস বিলম্ব হয়েছে। আর প্রকল্পের সূচনাতে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ৫ বছর পর এই সমীক্ষা করা হলেও তাতেও দুর্বলতা ছিল।

প্রকল্পের প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো উপজেলা পরিষদ। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত সমস্যাবলির সুষ্ঠু সমাধান এখানে হয়ে থাকে। সরকারি পরিষেবা ব্যবস্থার উন্নয়নে স্থানীয় সরকার যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ভূমিকা পালন করে, সেহেতু সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জনসেবার মান উন্নত করতে সরকার স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার স্থানভেদে নাগরিকদেরকে ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পেশ করার সুযোগ প্রদান করার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নেরও সুযোগ সৃষ্টি করে। এ জন্য ‘উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ (২য় পর্যায়) (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪০০টি উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে (৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা পৃষ্ঠা-৩৬০ ও ৩৬৮)। যা সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অধিকন্তু প্রকল্পটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য ১-সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্য নির্মূল; লক্ষ্য ৫-লিঙ্গ সমতা অর্জন; লক্ষ্য ৯-শিল্প, উদ্ভাবন ও উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ; লক্ষ্য ১৩-জলবায়ু বিষয়ে পদক্ষেপ এবং লক্ষ্য ১৬-শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ, সবার জন্য ন্যায়বিচার, সব স্তরে কার্যকর, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা-অর্জনে সহায়তা করবে।

তা ছাড়া উপজেলা পরিষদ আইন ২০১১ (সংশোধিত) অনুসারে প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান ও দুইজন ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় প্রশাসনের প্রকৃত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সৃষ্ট নতুন জনপ্রতিনিধিদের অফিস ছাড়াও সভা কক্ষ প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে স্থাপত্য অধিদফতর কর্তৃক প্রণীত ও বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত নতুন ডিজাইন মোতাবেক নতুন উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং বিদ্যমান কমপ্লেক্স সম্প্রসারণের কাজ চলমান আছে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি ২৩৫টি উপজেলার জন্য ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌনে ৫ বছরে বাস্তবায়নের জন্য একনেক থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন মেয়াদে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা।

প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রম : প্রকল্পের তথ্য বলছে, পৌনে ৫ বছরের এই অবকাঠোমা সম্প্রসারণ প্রকল্পে প্রধান কাজ হলো, ১৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন ৩৩ হাজার ৯৯৫ ঘনফুট, ২৩৫টি প্রশাসনিক ভবন ও হলরুম নির্মাণ, ৭৫টি আবাসিক ভবন নির্মাণ। অন্যান্য কার্যক্রমে, অভ্যন্তরীণ সড়ক-১৪.৬২০ কিলোমিটার, রিটেইনিং ওয়াল-২০০ মি., সীমানা প্রাচীর-৭.১৯৭৫৯ কিলোমিটার ও ড্রেন নির্মাণ-৩.০৮০ কিলোমিটার।

গতি ঢিমেতালে, মেয়াদ বাড়ে লাফিয়ে : অগ্রগতি মাত্র ৫২ শতাংশ

মূল অনুমোদনে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু কাজের অগ্রগতি মন্থর হওয়ায় এটি ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর ৩৬ মাস বা ৩ বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় ৪৮ কোটি টাকা। কিন্তু তাতেও কাজে কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে ২০২৩ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকারের আমলে পরিকল্পনামন্ত্রী আবার মেয়াদ বাড়িয়ে দেন। এরপর ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আবার সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করে খরচ ২ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮ বছর তিন মাসে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫২.৬২ শতাংশ। আর এই পর্যন্ত কাজ করতে ব্যয় হয়েছে ৫০.৬২ শতাংশ অর্থ। এখন এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন এবং মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ

বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডি সংশ্লিষ্টরা জানান, নবসৃষ্ট খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলাতে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম পর্যায়) বাস্তবায়ন হয়নি। সেটা না হওয়ায় ও বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলা কমপ্লেক্সের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ পরিকল্পনা কমিশন হতে গত ১৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখ প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ায় পরবর্তীতে তা এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর ৭টি উপজেলায় সম্প্রসারিত প্রশাসনিক ভবন ও হলরুম নির্মাণ এবং নির্মিতব্য আবাসিক ভবনের স্থানে পুরাতন ভবন ও গাছগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে অপসারণ করতে বিলম্ব হয়। উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম পর্যায়) হতে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২টি পুনর্গঠিত (কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর ও লাকসাম) উপজেলার সমুদয় কাজ এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সমীক্ষায় দুর্বলতা : জানা গেছে, বিধি অনুযায়ী, সম্পন্ন সকল বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপির ১ম সংশোধনী দাখিলের পরে জুলাই ২০২২ সালে পিইসি সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন করা হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা ছিল। যার ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, স্থানভেদে নকশায় ত্রুটিবিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়। এ ছাড়া সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকার সচিত্র বিস্তারিতভাবে উল্লেখ না থাকায় (কোথায় পুরাতন ভবন বা গাছ কাটা বা অপসারণ করতে হবে), পরবর্তীতে এ সম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজ শুরুর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে। তাই সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে যদি সুস্পষ্টভাবে ধারাবাহিক কোনো কর্মপরিকল্পনা থাকত (কোন কার্যক্রমগুলো আগে শুরু করা যেতে পারে বা কোনগুলো শুরুতে সময় বেশি লাগতে পারে) তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় কম লাগত এবং মেয়াদ বৃদ্ধির প্রয়োজন হতো না।

প্রকল্প পরিচালক ও এলজিইডি যা বলছে

এলজিইডি ও ৩ ফেব্রুয়ারির পর্যালোচনা সভাকে প্রকল্প পরিচালক জানান যে, সর্বশেষ অনুমোদিত ডিপিপি গত ২০২৫ সালের ২৪ জুন একনেক সভায় নতুন ডিজাইনের ৪৯টি (৮ তলা ভিত্তিবিশিষ্ট ৬ তলা) ভবন নির্মাণের অনুমোদন হয়। পরবর্তীতে গত ২ মাস পরই পিএসসি সভায় অনুমোদিত ডিজাইনের আয়তন ও লে-আউট প্ল্যান সঠিক রেখে লবির কলাম অপসারণ ও নান্দনিকতা বৃদ্ধি করে কাজ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। সে অনুযায়ী বিদ্যমান ৩টি জোনের কোস্টাল, সিসমিক ও নরমাল) জন্য বিএনবিসি-২০২০ অনুযায়ী উপরিকাঠামোর স্ট্রাকচারালসহ অন্যান্য ডিজাইনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে ৪৯টি ভবনের পৃথকভাবে ফাউন্ডেশন ডিজাইন প্রণয়নপূর্বক অনুমোদন কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে স্থগিত আছে। ৬ তলা ভবন (লিফটসহ) বাস্তবায়নের জন্য ন্যূনতম ২ থেকে ২.৫ বছর সময় বৃদ্ধি প্রয়োজন। সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট মাটি ভরাট করে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে হবে। উল্লেখিত বিষয় বিবেচনায় প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত ২ বছর সময় প্রয়োজন।

পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডির সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান শহীদুল কনসালট্যান্ট লিমিটেড প্রকল্পটি সম্পর্কে বলেছে, এ প্রকল্পে শুরু থেকে তিনবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ ব্যাহত হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বিভাগ থেকে জারিকৃত পরিপত্রের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য তিন বছরের জন্য পূর্ণকালীন দায়িত্বে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। সময়মতো অর্থছাড় না হওয়ায় ডিপিপি/আরডিপিপি অনুযায়ী বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত এবং সে অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দরপত্র আহ্বান না করায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রেখে প্রণীত ডিপিপি বা আরডিপিপির বছরভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুসরণ করে ক্রয় কার্যক্রম সম্পাদন করা প্রয়োজন।