ব্রি-তে অনিয়মের ছড়াছড়ি : পদোন্নতি, নিয়োগ টেন্ডারে পুরনো সিন্ডিকেটের দাপট

Printed Edition

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

  • নিয়োগে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে, ভুয়া প্রার্থী ধরা
  • উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) আবারো অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ৭৫টি শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রমে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। ইতোমধ্যে দু’জন ভুয়া প্রার্থী শনাক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ হয়েছেন। আরো কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যোগদান না করায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ব্রি’র একাধিক সূত্রের দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যার সাথে জড়িত রয়েছেন পরিচালক (গবেষণা), উপ-পরিচালক (প্রশাসন) এবং কয়েকজন সহকারী পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বোর্ডকে প্রভাবিত করে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ভুয়া পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার এলাকার হওয়ায় বিষয়টি আরো সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে।

গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশের পর ‘ইন্ডাকশন ট্রেনিং’ নামে সীমিত কার্যক্রম চালু করলেও সেখানে মাত্র ১৮টি পদের বিপরীতে ৩২ জনকে ডাকা হয়। অথচ ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের আরো ৪৩ জন নিয়োগপ্রাপ্তের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বিষয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্রিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যার সূত্রপাত বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট সাবেক বিতর্কিত মহাপরিচালক ড. শাজাহান কবীরের সময়ে। ওই সময় একাধিক কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়, যারা প্রতিষ্ঠানটিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প প্রণয়ন ছাড়াই আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে দু’জনকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হয়। একইভাবে একজনকে ব্রি’র প্রধান এবং আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহের অবকাঠামো নির্মাণ ও যানবাহন মেরামতসংক্রান্ত কমিটির মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়, যার মাধ্যমে উচ্চ ব্যয়ে বিভিন্ন ভবন, স্কুল নির্মাণ, রাস্তা, গেট, নালা ও অন্যান্য কাজ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। পদ না থাকা সত্ত্বেও আলোচিত দু’জন কর্মকর্তা চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার পদে পদোন্নতি নেন। তাদের মধ্যে একজন কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পদে পদোন্নতি পেলেও তিনি অফিসে কখনো যোগ দেননি বলেও জানা গেছে।

একজন ডিডি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি দেশী-বিদেশী প্রকল্প থেকে কমিশন নিয়ে ঢাকায় ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে এক সময় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলেও সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমান মহাপরিচালক ড. খালেকুজ্জামানের সময়েও এই সিন্ডিকেট নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর এই চক্রে আরো বেশ কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিয়োগ, টেন্ডার, বদলি, বাসা বরাদ্দ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অন্যদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের শাস্তি না দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিযুক্ত করেছেন, যা প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে। পুরাতন ও অসম্পূর্ণ কাজের বিল আদায়ে বর্তমান মহাপরিচালকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও জানা গেছে।

এছাড়া বয়সসীমা শেষ হওয়ার পরও এনআইডি সংশোধনের মাধ্যমে অন্তত চারজন কর্মচারী চাকরিতে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন না করেও ‘ড.’ উপাধি ব্যবহার করে এক কর্মকর্তা ২০২২ সালে পদোন্নতি নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অতি সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কাওসার আহমেদকে পদোন্নতিও দেয়া হয়েছে। আরো জানা গেছে, রাতে গোপনে ভাইভা বোর্ড পরিচালনা করে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কার্যত একটি ‘প্যারালাল প্রশাসন’ গড়ে উঠেছে বলে দাবি করছেন একাধিক কর্মকর্তা। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কমিটিতে অতীতের সুবিধাভোগীদের অন্তর্ভুক্তি থাকায় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সাথে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।

এ বিষয়ে ব্রি’র মহাপরিচালক ড. খালেকুজ্জামান বলেন, ‘উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটিগুলো কাজ করছে। যেখানে অনিয়ম প্রমাণিত হবে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভবিষ্যতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।’

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্রি’র দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির চক্র ভাঙার এখনই উপযুক্ত সময়। তারা উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত, বিতর্কিত পদোন্নতি, নিয়োগ বাতিল এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।