সৎ ও আল্লাহভীরুতার কাজে সহযোগিতা করুন

Printed Edition
সৎ ও আল্লাহভীরুতার কাজে সহযোগিতা করুন
সৎ ও আল্লাহভীরুতার কাজে সহযোগিতা করুন

জাফর আহমাদ

সৎ, নেকি, আল্লাহভীতি ও কল্যাণের পথে সহযোগিতা করুন এবং অসৎ, গুনাহ ও অকল্যাণের কাজে কাউকে সহযোগিতা করবেন না। উভয় কাজের সওয়াব ও গুনাহ আনুপাতিক হারে আপনার আমলনামায় জমা হবে। সৎ হলে সৎ কাজের ভাগ পাবেন আর অসৎ ও অকল্যাণের কাজ হলে তার ভাগও আপনি পাবেন। উভয় কাজে সহযোগিতার জন্য পুরস্কার বা শাস্তি আপনাকে ভোগ করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘নেকি ও আল্লাহভীতির সব কাজে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। তার শাস্তি বড়ই কঠোর। (সূরা মায়েদা-২)

আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যে ব্যক্তি কল্যাণ ও সৎ কাজের সুপারিশ করবে, সে তা থেকে অংশ পাবে এবং যে ব্যক্তি অকল্যাণ ও অসৎ কাজের সুপারিশ করবে, সে তা থেকে অংশ পাবে। আর আল্লাহ সব জিনিসের প্রতি নজর রাখেন।’ (সূরা নিসা-৮৫)

উপরের দুই আয়াত ইসলামী জীবনব্যবস্থায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমাদের দ্বারা দৈনন্দিন যেসব কাজ সংঘটিত হয়, সেগুলোর প্রতি গভীর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। আমাদের শত শত কাজের মধ্যে এমন কোনো একটি কাজ, যা অত্যন্ত মামুলি বিষয়। যা সে নিজেও গভীরভাবে কোনো দিন চিন্তা করে দেখেনি এবং সমাজও এটিকে তেমন গুরুত্ব প্রদান করেনি। অথচ কাজটি ছিল স্রেফ সহযোগিতামূলক। কিন্তু এই সহযোগিতা এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দেয়া হয়েছে, যাদের আদর্শ কুফরি ও শিরকে পরিপূর্ণ। তার সহযোগিতা পেয়ে সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আল্লাহর নাফরমানির কাজে নিজেদের আরো বেশি করে সম্পৃক্ত করেছে। তার এই সহযোগিতা পেয়ে তোমরা এমন বড় বড় গুনাহের কাজ করে যাচ্ছ, যার আনুপাতিক হার উভয়ের আমলনামায় যোগ হচ্ছে। বিপরীত দিকে যদি ভালো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সহযোগিতা করা হয়, তাহলে সেই ভালো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেক কাজের ভাগও তার আমলনামায় যোগ হবে। সত্যিকার অর্থে এটি যার যেমন পছন্দ এবং যার যেমন ভাগ্য। কেউ আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা চালাবার এবং সত্যের শির উঁচু রাখার জন্য লোকদের উৎসাহিত করে- এর পুরস্কারও সে পায়। আবার কেউ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলার, তাদের নিবীর্য ও সাহসহীন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে- এর শাস্তিও সে পায়।

আমাদের দেশে মেম্বার, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, পৌর ও মহানগরী মেয়র, কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, এমপি নির্বাচন হয়। এসব নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়ে উল্লিখিত লোকগুলোকে নির্বাচিত করে। এসব নির্বাচনে যাদের পক্ষে যিনি ভোট প্রদান করেন তিনি মূলত তার পক্ষে সুপারিশ প্রদান করেন। তিনি যদি চোর-বাটপার, দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, চরিত্রহীন ও আল্লাহবিমুখ কোনো লম্পটকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন, তা হলে সে গুনাহ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতাকরল বা অকল্যাণ ও অসৎ কাজের পক্ষে সুপারিশ করল। তার এ কাজের জন্য আল্লাহর কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আরো মনে রাখতে হবে, তার ভোটে নির্বাচিত হয়ে যতগুলো কুকাজ, চুরি, দুর্নীতি করবে, প্রতিটি কাজের হিস্যা ওই ভোটারদের আমলনামায় যোগ হতে থাকবে। কিয়ামতের দিনে যখন তার হাতে আমলনামা দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবে আজ তোমার আমল তুমি নিজেই পড়ো। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘পড়ো নিজের আমলনামা, আজ নিজের হিসাব করার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাইল-১৪) সে দেখবে তার আমল ১০০ মণ গম চুরির গুনাহ লেখা রয়েছে, কোনো নারীর শ্লীলতাহানির গুনাহ রয়েছে, চাঁদাবাজির গুনাহ, জমি দখলের গুনাহ, টেন্ডারবাজির গুনাহ, গরিবের হক মারার গুনাহ ইত্যাদি আরো কত কী। সে আরজ করবে, হে আল্লাহ! আমি ও আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর কেউ কোনো দিন মেম্বার, মেয়র, চেয়ারম্যান ও এমপি ছিল না তা হলে এতগুলো গুনাহ আমার আমলনামায় যোগ হলো কী করে? আল্লাহ বলবেন, তোমার ভোটে নির্বাচিত হয়ে ওই ব্যক্তি উল্লিখিত যতগুলো গুনাহ করেছে, সেগুলোর আনুপাতিক হার যথাযথ ও নির্ভুলভাবে হিসাব কষে তোমার আমলনামায় যোগ করা হয়েছে। বিপরীত দিকে তার দ্বারা যতগুলো ভালো কাজ হয়েছে তার সওয়াবও সংশ্লিষ্ট ভোটারের আমলনামায় যোগ হবে। আপনি যদি ব্যক্তির আল্লাহভীরুতা, সৎ ও সততা দেখে ভোট দিয়ে থাকেন তাহলে প্রতিটি ভালো কাজের আনুপাতিক হার আপনার আমলনামায় যোগ হবে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্মর্তব্য যে, ওই সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু লোকটি ক্ষমতা পেয়ে সেও যদি দুর্নীতিবাজ চরিত্রহীন ব্যক্তিদের মতো গুনাহের কাজ সম্পাদন করে তাহলে সে গুনাহর ভাগ ভোটাররা পাবে না। কারণ সে তো ব্যক্তিকে ভোট দেয়নি, বরং ব্যক্তির সততা ও আল্লাহভীরুতাকে ভোট দিয়েছে। সে নেকি, আল্লাহভীরুতার সহযোগিতা করেছে এবং কল্যাণের সুপারিশ করেছে। সুতরাং গুনাহের বোঝা নির্বাচিত ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। এখানে ভোটার মুক্তি পেয়ে যাবে এবং নেকি, আল্লাহভীতি ও কল্যাণের কাজে সুপারিশ বা সহযোগিতা করার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত হবে।

একটি উদাহরণ পেশ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। দু’জন ব্যক্তি, যাদের একজন অন্ধ, অন্যজন ল্যাংড়া। একজনের দুটো পা নেই কিন্তু দুটো চক্ষু আছে, অন্যজনের দুটো চক্ষু নেই কিন্তু দুটো পা আছে। এ দু’জনকে একত্র করলে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের রূপ পাওয়া যায়। ল্যাংড়া দুটো চক্ষু দ্বারা পৃথিবীকে দেখতে পারে। কিন্তু দুটো পায়ের অভাবে সে পৃথিবীর অনেক কিছু ভোগ ব্যবহার বা মনের স্বাদ-আহলাদ চরিতার্থ করতে পারে না। চোখের সামনে নাগালের প্রায় কাছাকাছি একজনের গাছে আম ঝুলে আছে। কিন্তু আপসোস, দুটো পায়ের অভাবে খেতে পারছে না। দুটো পা থাকলে তো চুরি করে আম খেতে পারত। এমন সময় এক অন্ধ তার সামনে দিয়ে পথ চলছে। দুষ্টু ল্যাংড়ার মনে উদয় হলো যে, আমি আর অন্ধ দু’জন মিলে গেলেই তো আম খেতে পারি। অন্ধকে প্রস্তাব পেশ করল, ভাই অন্ধ আম খাবি?

ভাই! আমি একজন অন্ধ মানুষ, আম পাবো কোথায়? পৃথিবীটার কোথায় কি আছে তা তো আমি দেখতে পাই না। ল্যাংড়া বলল, আমি একজন ল্যাংড়া, পায়ের অভাবে একজনের গাছে আম ঝুলে আছে, খেতে পারছি না। তুমি আমাকে তোমার কাঁধে নিয়ে চলো আমি তোমাকে পথ দেখাব। দুজনে মিলে আম খাবো। যেই কথা সেই কাজ। মালিকের কাছে ধরা পড়ল, মালিক আমসহ ল্যাংড়াকে প্রহার শুরু করল। ল্যাংড়া বলছে, বাপুরে! আমার কি দোষ? আমি একজন ল্যাংড়া, আমার দুটো পা নেই, আমার কি কোনো সাধ্য ছিল আম পাড়ার? ব্যাটা অন্ধ তার কাঁধে করে আমাকে নিয়ে এসেছে। মালিক, তাই তো। পিটা ব্যাটা অন্ধকে। এবার অন্ধ বলছে বাপুরে! আমি একজন জন্মান্ধ, আমার দুটো চক্ষু নাই, আমি কি জানি আপনার আমগাছ কোথায়। ব্যাটা ল্যাংড়া আমাকে প্রস্তাব করেছে তাই তাকে কাঁধে তুলে এখানে নিয়ে এসেছি, মালিক দেখল, তাই তো। মালিক পড়ল বিপাকে। কিন্তু পরক্ষণেই মনের মধ্যে উদয় হলো, দোষ তো দু’জনেরই সমান। মালিক দু’জনকেই সাইজ করল।

আমরা জনগণ অন্ধ আর আমাদের নেতৃত্ব হলো ল্যাংড়া। আমরা তাদের কাঁধে করে মানে ভোট দিয়ে ক্ষমতার ওই চেয়ারটায় বসাই। মনে রাখবেন, ওই চেয়ারে বসে যতগুলো অকাজ, কুকাজ ও অবৈধ উপার্জন সে করবে তার ভাগ অন্ধ (জনগণ) : ল্যাংড়া (নেতৃত্ব) এর মধ্যে সমান আনুপাতিক হারে ভাগ হবে। আল কুরআনের পাশাপাশি সাধারণ যুক্তিও তাই বলে।

আমাদের দেশের এতগুলো ইসলামী সংগঠন, এগুলোর নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের ইলমি যোগ্যতা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই আয়াতগুলো প্রতিদিন তারা তেলাওয়াত করে কিন্তু আয়াতগুলোর গভীরে প্রবেশ করে না এবং এগুলোর আবেদনেও সাড়া দেয় না। মাঝে মধ্যে এমন বক্তব্য ও বিবৃতি প্রদান করে যা তার ইলম ও ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না। এ জন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা কুরআনকে টুকরো টুকরো করেছে। সুতরাং তোমার মালিকের শপথ, ওদের সবার কাছে আমি অবশ্যই প্রশ্ন করব। সেসব বিষয়ে, যা কিছু আচরণ তারা (কুরআনের সাথে) করত। (সূরা হিজর : ৯১-৯৩)

আমাদের অবস্থা ইহুদিদের মতো হয়ে গেছে। তারা তাদের দ্বীনকে ভাগ করে ফেলেছিল। তারা কোন কোন কথা মেনেছিল এবং কোন কোন কথা মানেনি। এর কারণে ইহুদিরা চরম দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছিল। আমাদের অবস্থাও আজ সেখানেই গিয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা কুরআনের হুকুম অনুযায়ী নামাজ, রোজা, হজ পালন করছি কিন্তু আল কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি না। কুরআন অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা করছি না। কুরআন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগুলো পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে আমরাও ইহুদিদের মতো কুরআনকে টুকরো টুকরো করছি। যার ফলে আমাদের জন্য পৃথিবীটা আজ ছোট হয়ে আসছে। এ করুণ পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে দ্রুত আমাদের কুরআনের কাছে ফিরে আসতে হবে এবং আল কুরআনের সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামকে অবশ্যই জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য বানাতে হবে ।

লেখক : প্রাবন্ধিক