লাশ, আতঙ্ক, গোপন চলাচল আর ফিসফাস কথোপকথন

পিলখানা ট্র্যাজেডি : দরবার হল থেকে ডিজির বাসভবন

২০০৯ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে বাংলাদেশ রাইফেলস-এর সদর দফতর পিলখানা সদর দফতর-এ যে ভয়াবহতা চলছিল, তার একটি অংশ উঠে আসে সাক্ষী নং-৯২, ৩৬, ২৫, ৫৫ ও অন্যান্য জবানবন্দীতে। দরবার হলের হত্যাযজ্ঞের পর রাতভর ছিল লাশ, আতঙ্ক, গোপন চলাচল, আর ফিসফাস কথোপকথন- যা ইঙ্গিত দেয়, ঘটনাটি ছিল শুধু আবেগের বিস্ফোরণ নয়; বরং সংগঠিত সহিংসতা।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টা : রাতভর লুকিয়ে থাকা, ফিসফাস, তারপর আবার হত্যাযজ্ঞ। ২০০৯ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে বাংলাদেশ রাইফেলস-এর সদর দফতর পিলখানা সদর দফতর-এ যে ভয়াবহতা চলছিল, তার একটি অংশ উঠে আসে সাক্ষী নং-৯২, ৩৬, ২৫, ৫৫ ও অন্যান্য জবানবন্দীতে। দরবার হলের হত্যাযজ্ঞের পর রাতভর ছিল লাশ, আতঙ্ক, গোপন চলাচল, আর ফিসফাস কথোপকথন- যা ইঙ্গিত দেয়, ঘটনাটি ছিল শুধু আবেগের বিস্ফোরণ নয়; বরং সংগঠিত সহিংসতা। আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বাধীন স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের সেই রক্ষক্ষয়ী সময়ের খণ্ডচিত্র উঠে আসে বিভিন্ন সাক্ষীর জবানে।

রাত ১২টা থেকে ভোর : ফলস সিলিংয়ে লুকিয়ে থাকা অফিসারের দেখা-

রাত প্রায় ১২টার দিকে মেজর মনিরুল আলম (সাক্ষ্য নং-৯২) বুঝতে পারেন- চার পাশ ফাঁকা। তিনি দরবার হলের ছাদ বেয়ে উপরে উঠে ফলস সিলিংয়ের ভেতর ঢুকে পড়েন। নিচে চলছে অস্ত্রধারীদের চলাফেরা, তিনি নিঃশব্দে লুকিয়ে থাকেন।

সেই অন্ধকারে বসে তিনি যা শুনেছিলেন, তা শীতল করে দেয় রক্ত- ‘সিচুয়েশন কন্ট্রোল আছে’। ‘শহীদ’ শব্দ বারবার উচ্চারিত। রাত ১টার দিকে একজন বলছে- ‘১৫ ঝাড়ে মাইরা শেষ। মোট ৬০-৭০ গেছে-’

আরেকজনের অভিযোগ- ‘ওরা আসে, আরাম করে, মজা খায়- আমাদের কষ্ট দেয়’

ডিজি ম্যাডামকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য

অচেনা ভাষায় কথাবার্তা- যা তিনি বুঝতে পারেননি। এই কথাগুলো থেকে স্পষ্ট- হত্যার সংখ্যা নিয়ে হিসাব, পরিকল্পনা ও সমন্বয় চলছিল।

২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল : পালানোর চেষ্টা, সকাল ৬টার দিকে এলাকায় সৈন্যের উপস্থিতি কম মনে হলে মেজর মনিরুল আলম বের হতে চান; কিন্তু চার দিক অনিরাপদ দেখে আবার ফলস সিলিংয়ে লুকান।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উদ্ধারকারীদল এলে তাকে গাড়িতে তুলে নেয়া হয়। গেটের কাছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন- ‘আপনি বেঁচে আছেন, পরে কথা হবে।’ এটি ছিল মৃত্যুকূপ থেকে ফেরা কয়েকজনের মধ্যে একজনের বিরল বেঁচে থাকার গল্প।

দরবার হলের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে ‘টার্গেট কিলিং’

১. গেটের সামনে গুলি : লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুল আলম একজন জেসিওর বাসায় লুকিয়ে জানালা দিয়ে দেখেন- এক জেসিওকে দুই অস্ত্রধারী কথাকাটাকাটির পর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে ফেলে দেয়।

কয়েক মিনিট পর- মেজর শাহনেওয়াজ, মেজর হুমায়ুন, মেজর সালেহ- হাত তুলে ৫ নম্বর গেটের দিকে যাচ্ছিলেন। তারপরই শোনা যায় গুলির শব্দ। কেউ আর ফেরেননি।

হাসপাতালের সামনে নির্মমতা

বিডিআর হাসপাতাল-এর বারান্দা থেকে এক সাক্ষী দেখেন- ডেন্টাল সার্জন লে. কর্নেল রবিকে ধাওয়া করা হয়। গুলি, মাটিতে পড়ে যাওয়া, আবার তুলে গুলি- শেষে ম্যানহোলে ফেলে দেয়া। এই হত্যার ধরন ছিল লাশ গুমের ইঙ্গিতবাহী।

ব্যাটালিয়ন লাইনে অফিসার খোঁজা

৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের এক অফিসার কোথাও লুকিয়ে আছেন- এই খবর শুনে এসএমজি হাতে একদল গিয়ে জানালা দিয়ে ব্রাশফায়ার চালায়। কারা মারা গেলেন- সাক্ষীরা জানতেন না; কিন্তু উদ্দেশ্য পরিষ্কার- ‘কোনো অফিসার বাঁচবে না’।

রাতের অদ্ভুত চলাচল : অ্যাম্বুলেন্স না ‘কভার-আপ’?

রাতের অন্ধকারে দেখা যায়- সাদা অ্যাম্বুলেন্স, পিকআপ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ঠেলাগাড়ি- বারবার দরবার হলের সামনে আসা-যাওয়া করছে। কেউ কিছু বহন করছে।

সাক্ষীদের ধারণা- সম্ভবত লাশ সরানো হচ্ছিল।

ডিজি বাসভবনেও হামলা

দরবার হলের হত্যার পর হামলাকারীরা যায় ডিজির বাসভবনে। সেখানে গুলির শব্দ, ভাঙচুর, বাসার কর্মচারী ও পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, একাধিক নিহত, রক্ত সিঁড়ি বেয়ে নিচে গড়িয়ে আসছিল- এমন বর্ণনাও রয়েছে সাক্ষ্যে। এটি ছিল কেবল বিদ্রোহ নয়- নেতৃত্বের পুরো কাঠামো নিশ্চিহ্ন করার অভিযান।

বিশ্লেষণে মনে হয়- এই সময়সীমার ঘটনাগুলো কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করে- হত্যার আগে ও পরে সমন্বিত যোগাযোগ; নির্দিষ্ট টার্গেট- শুধু অফিসার; লাশ সরানো/গোপন করার চেষ্টা; আতঙ্ক সৃষ্টি করে পুরো ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ এটি ছিল সংগঠিত, পদ্ধতিগত, পরিকল্পিত সহিংসতা- স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ নয়।

২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোর- একটি দীর্ঘ রাত। দরবার হলের ছাদের উপরে লুকিয়ে থাকা অফিসারের কানেই ধরা পড়েছিল ইতিহাসের নির্মম সত্য- মানুষ মারা যাচ্ছে, আর নিচে কেউ বলছে- ‘সব কন্ট্রোল আছে’।

এই ‘কন্ট্রোল’-এর মূল্য ছিল কয়েক ডজন পরিবারের চিরস্থায়ী শোক।