ঈদের আগে দেড় শতাধিক গার্মেন্ট টেক্সটাইলে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা

বিগত বছরগুলোতেও ঈদের আগে সড়ক অবরোধ, যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। আসছে ঈদুল ফিতরের আগেও বকেয়া বেতন, বোনাসকে কেন্দ্র করে ১৬৫টি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন
  • অর্ধেকের বেশি কারখানায় বেতন বকেয়া
  • নাসা গ্রুপের জমি বিক্রি করে বকেয়া পরিশোধের সুপারিশ

ঈদের আগে দেশের তৈরী পোশাক কারখানার বহু শ্রমিকের বেতন-বোনাস বকেয়া থাকে। এ সময় ঘোষণা ছাড়াই হুটহাট বন্ধ করে দেয়া হয় অনেক কারখানা, ছাঁটাই করা হয় কর্মীদের। এসব কারণে প্রতিবারই ঈদের সময় বকেয়া বেতন-বোনাসের দাবিতে সড়কে নামতে বাধ্য হন পোশাক শ্রমিকরা। বিগত বছরগুলোতেও ঈদের আগে সড়ক অবরোধ, যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। আসছে ঈদুল ফিতরের আগেও বকেয়া বেতন, বোনাসকে কেন্দ্র করে ১৬৫টি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এর মধ্যে ৮৭টি কারখানা ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত। শ্রমিক অসন্তোষ এড়াতে ৯ দফা সুপারিশ করা হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আসন্ন ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ ২০ অথবা ২১ মার্চ। এমতাবস্থায়, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক/শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ঈদের আগে ফেব্রুয়ারি মাসের পূর্ণ বেতনের সাথে মার্চ মাসের অগ্রিম অর্ধেক বেতনের দাবি উঠতে পারে। অন্যদিকে শ্রমিকরা অন্তত ১০ দিনের ঈদের ছুটি দাবি করতে পারেন। এমতাবস্থায় ফেব্রুয়ারি মাসের পূর্ণ বেতন, মার্চ মাসের অর্ধেক/আংশিক বেতন, ঈদ বোনাস ও ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে শ্রম অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, নাসা গ্রুপসহ বন্ধ হওয়া যেসব কারখানার শ্রমিকদের পাওনাদি বকেয়া রয়েছে সেসব কারখানার শ্রমিকরাও ঈদের আগে শ্রম অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। ঈদের আগে কোনো কারখানা ১৩(১) ধারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ বা শ্রমিক ছাঁটাই বা লে-অফ ঘোষণা করলে সেসব কারখানায় তাৎক্ষণিক শ্রম অসন্তোষের আশঙ্কা তৈরি হবে।

অসন্তোষ ঠেকাতে ৯ দফা সুপারিশ করা হয় গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে। সুপারিশগুলো হলো- ঈদের ছুটির আগে শত ভাগ কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের পূর্ণ বেতন, ঈদ বোনাস ও বকেয়া পাওনাদি পরিশোধ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কারখানাগুলোকে এখন থেকেই অধিক মনিটরিং করা যেতে পারে। ঈদ বোনাসের ডেডলাইন ১৫ মর্চ নির্ধারণ করা যেতে পারে।

গার্মেন্টস কারখানাগুলো মোটাদাগে ১৭ মর্চ থেকে ঈদের ছুটি দেয়া শুরু করবে। বাস্তবতা বিবেচনায় এ সময়ের মধ্যে ফেব্রুয়ারির বেতন ও ঈদ বোনাস প্রদানের পর মার্চ মাসের অগ্রিম অর্ধেক/আংশিক বেতন পরিশোধ করা ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্টস কারখানাগুলোর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। এমতাবস্থায়, ঈদের ছুটির আগে মার্চ মাসের অর্ধেক/আংশিক বেতনের বিষয়টি বাধ্যতামূলক না করে বরং কারখানাভেদে মালিক-শ্রমিক আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া যেতে পারে।

নাসা গ্রুপের (আশুলিয়া, গাজীপুর, কুমিল্লা ইপিজেড, সিইপিজেড) বন্ধ হওয়া ১৭টি কারখানার শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিটের অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ বকেয়া রয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রুপের চেয়ারম্যানের অজব্দকৃত ৩টি জমি বিক্রয়ের মাধ্যমে উক্ত পাওনাদি পরিশোধের কথা থাকলেও দুদকের আপত্তির ভিত্তিতে হাইকোর্ট উক্ত জমি বিক্রি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দুদকের অন্যতম একটি আপত্তি হলো শ্রমিকদের পাওনাদির (১০০ কোটি) চেয়ে জমি ৩টির বাজার মূল্য (৮০০ কোটি) অনেক বেশি। এমতাবস্থায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুদক ও নাসা গ্রুপ কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে শ্রমিকদের পাওনাদির সমমূল্যের প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমি বিক্রয় করে পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

ইউরোজোন, মাসুদ অ্যাপারেলস, আল্টিমেট ফ্যাশন, এইচআর টেক্সটাইল, মাহমুদ ডেনিমস, রাবাব গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ, সিজল ড্রেস, ডার্ড গ্রুপ, জেএমএস-এর শ্রমিকদের বকেয়া সার্ভিস বেনিফিটের দাবিতে ঈদের পূর্বে শ্রম অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় ঈদের আগে উক্ত কারখানাগুলোর পাওনাদি পরিশোধের বিষয়ে বিশেষ মনিটরিং করা যেতে পারে।

ঈদের আগে বা পরে জেনারেল ডিউটি করিয়ে হলেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য সরকারিভাবে ঘোষিত ছুটির সাথে মিল রেখে ছুটি দেয়া যেতে পারে।

কোনোক্রমেই ঈদের আগে ১৩(১) ধারায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ, লে-অফ ও শ্রমিক ছাঁটাই এর ঘোষণা দেয়া যাবে না এমন কড়া নির্দেশনা দিতে হবে।

ঈদের আগে জনদুর্ভোগ এড়াতে বেতন-ভাতা বা ছুটিকে কেন্দ্র করে কোনো অবস্থাতেই যেন শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ না করে সে বিষয়ে সংগঠনের নেতাসহ সবাইকে একযোগে কাজ করার কড়া নির্দেশনা দেয়া কেবল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব শ্রম অসন্তোষ নিরসনের গুরুত্বারোপ করা।

শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সুবিধার্থে জরুরি ব্যাংকিং লেনদেনের জন্য ১৩-১৪ মার্চ ও ১৭ মার্চ গার্মেন্টস শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং সেবা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ঈদের অন্তত ১০ দিন গার্মেন্টসকে দেয়া বকেয়া নগদ সহায়তা/প্রণোদনা ছাড় করণে অর্থমন্ত্রণালয়/বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রণালয়/বাংলাদেশ ব্যাংক/বিজিএমইএ/ বিকেএমইএর সাথে সমন্বয় করা যেতে পারে।

ঈদের ছুটিতে শ্রমিকদের যাত্রাপথে যানজট প্রশমন, দুর্ঘটনা, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও বাড়তি বাস ভাড়া প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হবে। যানজট প্রশমনে অঞ্চলভেদে পর্যায়ক্রমিক ছুটি দেয়া যেতে পারে।

এ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রমজানের ঈদের ছুটির আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ করতে হবে। ঈদের আগে কারখানাগুলো কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারবে না। এ জন্য কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, গ্যাস সঙ্কটসহ অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা কারণে চাপে আছে রফতানিমুখী পোশাকশিল্প।

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির আওতাধীন মোট কারখানার প্রায় ৫২ দশমিক ৬০ শতাংশ বা পাঁচ হাজার ৩১৩টি শিল্প ইউনিট বুধবার পর্যন্ত ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করেনি। এসব কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শিল্প পুলিশের তথ্যে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করেছে মাত্র চার হাজার ৭৮৭টি কারখানা, যা মোট কারখানার ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। অন্য দিকে ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত উৎসব ভাতা দিয়েছে মাত্র এক হাজার ৬১৯টি কারখানা, যা মোট ইউনিটের প্রায় ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ দিকে জানুয়ারি মাসের বেতনও এখনো পরিশোধ হয়নি এমন কারখানার সংখ্যা ২৬৩টি। এর মধ্যে ১৩৯টি টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান। ফলে ঈদকে সামনে রেখে শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।