পোশাক রফতানিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত টেকসই প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক (আরএসজি) খাত আবারো রফতানি আয়ে ইতিবাচক ধারায় ফেরার বার্তা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) পোশাক খাত থেকে মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) তুলনায় এই আয় প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বা ৯.৭৯ শতাংশ বেশি। একই সাথে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৭৮ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা বলছে- এই সাময়িক গতিকে পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই প্রবৃদ্ধির সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের সাময়িক চাহিদা বৃদ্ধি, ঈদুল আজহাকে ঘিরে অতিরিক্ত চালান পাঠানো, অনুকূল বাজার পরিস্থিতি এবং বিগত প্রান্তিকগুলোর দুর্বল ভিত্তির প্রভাবেই মূলত এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। ফলে সামগ্রিক বৈশ্বিক চাহিদার টেকসই পুনরুদ্ধার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগ প্রকাশিত ‘ছঁধৎঃবৎষু জবারবি ড়ভ জবধফুসধফব এধৎসবহঃং (জগএ): অঢ়ৎরষ-ঔঁহব ড়ভ ঋণ২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।

শেষ প্রান্তে বড় লাফ : মূল চালিকাশক্তি নিটওয়্যার : ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অর্জিত মোট ১০,০৯৮.২৯ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের মধ্যে : নিটওয়্যার : ৫,৪৯৯.৬২ মিলিয়ন ডলার; ওভেন : ৪,৫৯৮.৬৭ মিলিয়ন ডলার। আগের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রান্তিকে মোট আরএমজি রফতানি ছিল ৯,১৯৭.৮০ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ৯০০.৪৯ মিলিয়ন ডলার। এই পুনরুদ্ধারের বিন্যাসটি লক্ষণীয়। প্রান্তিকভিত্তিক হিসেবে নিটওয়্যারের রফতানি বেড়েছে ১৯.২১ শতাংশ, যেখানে ওভেনের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় স্থবির- মাত্র ০.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকের উল্লম্ফনের মূল চালিকাশক্তিই ছিল নিটওয়্যার।

তবে বছরওয়ারি তুলনায় চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। অর্থবছর ২৫-এর একই প্রান্তিকের তুলনায় নিটওয়্যারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯.৫৯ শতাংশ এবং ওভেনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.২৪ শতাংশ। বছরওয়ারি তুলনায় ওভেন এগিয়ে থাকলেও প্রান্তিকভিত্তিক দ্রুত পুনরুদ্ধারে নিটওয়্যার অনেক সামনে। এটি বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের ধরনভেদে চাহিদা ও অর্ডারের সময়সূচির প্রভাবকে স্পষ্ট করে।

পুরো অর্থবছরের ছবি : প্রবৃদ্ধি ০.৯৬% : শেষ প্রান্তিকের ১০.৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পুরো খাতের সামগ্রিক চিত্র ঢেকে দিতে পারে না। পুরো অর্থবছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।

২০২৬ অর্থবছরে মোট আরএমজি রফতানি : ৩৮,৯৬৯.৭২ মিলিয়ন ডলার

২০২৫- অর্থবছরে মোট আরএমজি রফতানি : ৩৯,৩৪৬.৭১ মিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে পুরো অর্থবছরে বছরওয়ারি প্রকৃত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ০.৯৬ শতাংশ (প্রায় স্থবির)। অর্থাৎ বছরের শেষ প্রান্তিকের উত্থান পুরো বছরের দুর্বলতাকে পুরোপুরি পুষিয়ে দিতে পারেনি।

অধিকন্তু,২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ৪৮,৩৮৩.৪৫ মিলিয়ন ডলার, যার ৮০.৫৪ শতাংশই এসেছে পোশাক খাত থেকে। এই হিসাব জাতীয় অর্থনীতির একক শিল্পনির্ভরতার বড় কাঠামোগত ঝুঁকিকে আবারও উন্মোচিত করেছে।

নিট বৈদেশিক আয় ৬.২৩ বিলিয়ন ডলার : গ্রস বা মোট রফতানি আয় দিয়ে পোশাক খাতের প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের চিত্র পাওয়া যায় না, কারণ উৎপাদনে বিপুল কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী: কাঁচামাল আমদানি ব্যয় (এপ্রিল-জুন অর্থবছর ২৬): ৩,৮৬৯.৭৬ মিলিয়ন ডলার (মোট আরএমজি রফতানির ৩৮.৩২%)। প্রকৃত বা নিট রফতানি আয় : ৬,২২৮.৫৩ মিলিয়ন ডলার।

সহজ কথায়, ১০০ ডলারের পোশাক রফতানি থেকে কাঁচামাল আমদানি বাবদ ৩৮.৩২ ডলার বাদ দিলে বাংলাদেশের নিট অর্জন থাকে প্রায় ৬১.৬৮ ডলার।

নিট আয়ের এই সূচকটি ইতিবাচক। আগের প্রান্তিকের (৫,৬৪২.৬৫ মিলিয়ন ডলার) তুলনায় তিন মাসে নিট আয় বেড়েছে ১০.৩৮ শতাংশ। এমনকি গত বছরের একই প্রান্তিকের (৫,১৭৫.৯৫ মিলিয়ন ডলার) তুলনায় নিট প্রবৃদ্ধি ২০.৩৪ শতাংশ।

কাঁচামাল নির্ভরতা ও নীতিসহায়তা : নিট আয়ের উন্নতি হলেও কাঁচা তুলা, ম্যান-মেইড ফাইবার, সুতা, টেক্সটাইল ফ্যাব্রিকস ও এক্সেসরিজের ওপর আমদানিনির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা, জ্বালানি ও পরিবহনের দাম বাড়লে কারখানার মুনাফায় সরাসরি ধস নামে।

এই সঙ্কট ও তারল্যচাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন নীতিসহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে

১. প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট স্কিম : ২০২৬ সালের এপ্রিলে চালু হওয়া ৫,০০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম।

২. রফতানি সহজীকরণ প্রি-ফাইন্যান্স ফান্ড : ১০,০০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে কাঁচামাল ক্রয়ে আর্থিক সহায়তা।

৩. গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড ও ইডিএফ : পরিবেশবান্ধব রূপান্তর ও বৈদেশিক মুদ্রায় কাঁচামাল আমদানির সুবিধা।

বাজারকেন্দ্রীকরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনিশ্চয়তা : বাংলাদেশের পোশাক রফতানি এখনো মূলত পশ্চিমাকেন্দ্রিক। মোট রফতানির ৭১.৬৯ শতাংশ (৭,২৩৯.৫১ মিলিয়ন ডলার) আসছে মাত্র ৯টি দেশ থেকে : যুক্তরাষ্ট্র ২,১৪৬.৪১ মিলিয়ন ডলার (শীর্ষ বাজার); জার্মানি ১,১০৮.৭৬ মিলিয়ন ডলার; যুক্তরাজ্য ১,০৮৪.৯৯ মিলিয়ন ডলার; স্পেন ৮৯২.৫৪ মিলিয়ন ডলার; নেদারল্যান্ডস ৫৭৬.৯৭ মিলিয়ন ডলার; ফ্রান্স ৫২২.৭১ মিলিয়ন ডলার; কানাডা ৩৮১.৫২ মিলিয়ন ডলার; ইতালি ৩৭০.৪৪ মিলিয়ন ডলার; বেলজিয়াম (বাকি অংশ)

সীমিত বাজারে এক বা একাধিক বাজারে অতিরিক্ত নির্ভরতা পোশাক খাতের বড় দুর্বলতা। বিশেষ করে মার্কিন বাজারের শুল্কনীতি, সরবরাহ-শৃঙ্খলের পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

উদীয়মান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের পথরেখা : কম শ্রমব্যয় ও শুল্কসুবিধার দিন দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু সস্তা দাম নয়, বরং কম লিড টাইম, গ্রিন প্রোডাকশন, কম কার্বন নিঃসরণ, ট্র্যাসেবিলিটি এবং হাই-ভ্যালু প্রোডাক্ট দাবি করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে তিনটি মূল কৌশলে জোর দিতে হবে।

পণ্যের বৈচিত্র্যায়ন : বেসিক টি-শার্ট ও সাধারণ ওভেন পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, সিন্থেটিক অ্যাপারেল ও ফ্যাশন-ওরিয়েন্টেড পোশাকে শিফট করা।

বাজারের বৈচিত্র্যায়ন : প্রথাগত মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারের বাইরে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুতবর্ধনশীল বাজারে শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করা।

উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা : ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ-গ্যাস, শ্রম ও ঋণের খরচের বিপরীতে প্রতি শ্রমঘণ্টায় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত করা।

প্রসঙ্গত, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের ১০.১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি অর্জন অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে পুরো অর্থবছরে কম প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ মনে করিয়ে দেয় যে সঙ্কট এখনো কাটেনি। এই সাময়িক সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য, নিজস্ব কাঁচামাল ও নতুন বাজারে রূপান্তর ঘটাতে না পারলে- এই বৃদ্ধি কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী উল্লম্ফন হিসেবেই রয়ে যাবে।