মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েত-বাহরাইন ও কাতারে ইরানের পাল্টা হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দাফনের প্রস্তুতির মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানে টানা দ্বিতীয় দিনে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় ইরানে কয়েকজন নিহত হয়েছেন। ইরান জানিয়েছে, জবাবে তারা কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় আবারো হামলা শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা থেকে পুনরায় শুরু হওয়া এ সঙ্ঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসি।

টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কয়েক দশকের বৈরী দুই দেশ পরস্পরের ওপর হামলা চালায়। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনের মার্কিন হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মার্কিন হামলায় রেলসেতুসহ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এসব হামলাকে তারা ‘জঘন্য যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রশাসনকে ‘অমানবিক ও মানসিক বিকারগ্রস্ত’ উল্লেখ করে ‘অশালীনতা, মিথ্যাচার ও সামরিক আগ্রাসনের’ অভিযোগ আনা হয়। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ হামলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ শহরের উপকণ্ঠে তিনজন নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবারের অভিযানে ইরানের প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার। অন্য দিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ড্রোন ব্যবহার করে কুয়েতে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কাতারের একটি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং বাহরাইনের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের অংশ বলে তারা জানিয়েছে।

এর আগে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার কথা জানায়। এএফপির এক সংবাদদাতা জানান, বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বৃহস্পতিবার সকালে তৃতীয়বারের মতো বিমান হামলার সতর্কসঙ্কেত বাজানোর সময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই রাতের বেলায় ইরান হামলা চালিয়েছিল। আইআরজিসি অভিযোগ করেছে, খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে আড়াল করতেই যুক্তরাষ্ট্র রেলসেতুতে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

বুধবার হামলা-পাল্টা হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’। তবে তিনি আলোচনার পথও খোলা রাখেন এবং বলেন, যেকোনো সামরিক অভিযান দ্রুত শেষ হবে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী এখনো বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার আগে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও এখন ইরান এ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে। বুধবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান কিছুক্ষণ আগে যোগাযোগ করেছে এবং তারা ‘খুবই আগ্রহের সাথে একটি সমঝোতা করতে চায়’। একই সাথে তিনি ইরানিদের ‘কিছুটা উন্মাদ’ বলেও মন্তব্য করেন।

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বৃহস্পতিবার বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী কেবল ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থাপনার অধীনেই খুলে দেয়া হবে।’ তিনি এক্সে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনো শেখেনি যে, ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিণতি আছে। স্পষ্ট করে বলছি- আপনারা হামলা করলে, পাল্টা হামলার মুখে পড়বেন।’

গত কয়েক দিনে ইরান অন্তত তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক আকারে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। গত মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল।

তবে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)-এর বিশ্লেষক এলি জেরানমায়ে বলেন, গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতাস্মারক (এমওইউ) ‘অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে’, কারণ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘর্ষ। তার মতে, ‘তবু তেহরান ও ওয়াশিংটনের সামনে কূটনৈতিক পথ ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই, আর সেই পথই এমওইউয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।’

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বুধবার থেকে শুরু হওয়া মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশের পাঁচটি প্রদেশজুড়ে অন্তত ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা কুয়েতে একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম, কাতারে একটি আর্লি ওয়ার্নিং স্যাটেলাইট অ্যান্টেনা সাইট এবং বাহরাইনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে। এই আক্রমণগুলোতে বিপুলসংখ্যক বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে তেহরান। এক বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্রবাহিনী মার্কিন প্রশাসনের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বোকা প্রেসিডেন্ট’-এর লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষা কোনো অবস্থাতেই পূরণ হতে দেয়া হবে না এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত ইসলামিক বিপ্লবের সুমহান আদর্শ রক্ষা করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাথে কাতার-পাকিস্তানের যোগাযোগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক হামলা বন্ধ ও সমঝোতা অনুযায়ী পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে দেশ দু’টির সাথে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেছে পাকিস্তান ও কাতার। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন গতকাল এই তথ্য জানিয়েছে। তেমনি পাকিস্তানি সরকারি সূত্র আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে নিশ্চিত করেছে যে, ইসলামাবাদ সমঝোতাস্মারকের আলোকে ওয়াশিংটন এবং তেহরানকে বৈরিতা বন্ধ করতে রাজি করানোর জন্য কাজ চলছে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘আমরা কাতারকে সাথে নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সাথে যোগাযোগ রাখছি, যাতে উভয় পক্ষ শত্রুতা দূর করে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আলোচনায় ফিরে আসে।’

খামেনিকে মাশহাদে দাফন

এ দিকে ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির দাফন গতকাল বৃহস্পতিবার সম্পন্ন হওয়ার কথা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই খামেনি তার পরিবারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সদস্যসহ নিহত হন। সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ও তার জন্মস্থান মাশহাদে খামেনিকে দাফন করার কথা ঘোষণা করা হয়। তেহরান, কুম এবং ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির কফিনবাহী বিমান বৃহস্পতিবার সকালে মাশহাদে পৌঁছায়। সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ইরান শাসনকারী খামেনির দাফন অনুষ্ঠান নতুন নেতৃত্বের ঐক্য প্রদর্শনের সুযোগ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব একসাথে থাকার বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তিনি কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ করেছেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলায় তিনিও আহত হন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে খামেনির কফিনবাহী বিমানকে অন্তত একটি যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে মাশহাদে নিয়ে যায় বলে সর্বোচ্চ নেতার দফতরের প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে।