বর্ষায় পানি ধরে রাখতে না পেরে ধসে পড়ছে ন্যাড়া পাহাড়

পাহাড় কেটে অবাধ বসতি গড়া বন্ধের তাগিদ গবেষকদের

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পাদদেশে ঘটে চলেছে ভয়াবহ প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত অর্ধশতাব্দীতে চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি বা শতাধিক পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে। যে কয়টি পাহাড় এখনো টিকে আছে, পাহাড়খেকোদের লোলুপ দৃষ্টিতে সেগুলোও একের পর এক বিলীন হওয়ার পথে।

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো
Printed Edition

পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও হ্রদের অপরূপ সমারোহের শহর চট্টগ্রাম; কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই অঞ্চলের পাহাড়গুলোই এখন অনিয়ন্ত্রিত কাটার কারণে মানবিক সঙ্কটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ের পাদদেশে ঘটে চলেছে ভয়াবহ প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত অর্ধশতাব্দীতে চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি বা শতাধিক পাহাড় বিলুপ্ত হয়েছে। যে কয়টি পাহাড় এখনো টিকে আছে, পাহাড়খেকোদের লোলুপ দৃষ্টিতে সেগুলোও একের পর এক বিলীন হওয়ার পথে।

অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়খেকো চক্র চট্টগ্রাম শহরের অন্তত ৩৪টি স্থানের পাহাড়ি জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে রেখেছে, যাতে সহজে তা কেটে ফেলা যায়। একের পর এক পাহাড় ধ্বংসের সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য, যার ফলে দ্রুত বাড়ছে স্থানীয় তাপমাত্রা। বর্ষাকালে বৃক্ষহীন এসব ন্যাড়া পাহাড় প্রচুর পানি শোষণ করে একপর্যায়ে তা ধরে রাখতে না পেরে ভয়াবহ ধসের সৃষ্টি করছে। এতে যেমন জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাহাড়ি মাটি ধুয়ে এসে নালা-নর্দমা ভরাট হওয়া।

পাহাড় কাটার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্রের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধেও পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। পাহাড়ি এলাকা কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতিতে সার্ভিস প্রোভাইডারদের (বিদ্যুৎ ও পানি) সংযোগও পৌঁছে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে মাটি বিক্রির রমরমা বাণিজ্য তো রয়েছেই।

গবেষকদের মতে, পাহাড় কোনোভাবেই অবাধ বসতি স্থাপনের স্থান নয়। এটি প্রকৃতির এমন এক সৃষ্টি, যা মানুষ পুনরায় তৈরি করতে পারে না। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড় রক্ষায় নদী রক্ষা কমিশনের আদলে একটি শক্তিশালী ‘পাহাড় রক্ষা কমিশন’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পাহাড় কাটার ইতিহাস ও বর্তমান চিত্র

চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার সঠিক ইতিহাস বের করা কঠিন হলেও ঐতিহাসিক রেকর্ড থেকে জানা যায়, ১৭৬০ সালে প্রথম ইংরেজরা পাহাড় কেটে ও গাছপালা সাফ করে এই অঞ্চলের নগর অবকাঠামো তৈরি শুরু করে। এর আগে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল প্রায় অক্ষত ছিল। গবেষকদের মতে, ১৯১০ সালের গোড়ার দিকে চট্টগ্রাম শহরে ২০০টিরও বেশি পাহাড় ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রশাসনিক নিরাপত্তার স্বার্থে পাহাড়ের চূড়ায় সরকারি প্রধান ভবনগুলো স্থাপন করা হতো; যেমন- পরীর পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত জজকোর্ট ভবন। পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পাবলিক ভবন গড়ে ওঠে।

এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৮৭২ সালে চট্টগ্রাম শহরে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ হাজার ৭৮০ জন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চট্টগ্রাম বন্দর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে গুরুত্ব পাওয়ায় নগরে দ্রুত জনসংখ্যার চাপ বাড়ে। মানুষের বাসস্থানের সংস্থান করতে গিয়ে শহরের পাহাড় কাটা ও রূপান্তরের প্রবণতা শুরু হয়। ১৯৫০-এর দশকে নাসিরাবাদ, পাহাড়তলী, ফৌজদারহাট ও ভাটিয়ারি এলাকায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয়। তবে সে সময় পাহাড় কাটার মাত্রা সীমিত ছিল এবং তা পরিবেশের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত হলে অপরিকল্পিত নগরায়নের গতি বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে গত ৫০ বছরে চট্টগ্রাম শহর শতাধিক ছোট-বড় পাহাড় হারিয়েছে।

অন্য দিকে ২০১৭ সালে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নামলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বিশাল আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়, যা নতুন করে পরিবেশগত সঙ্কট তৈরি করেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, কক্সবাজারের চকরিয়া এবং উত্তর চট্টগ্রামের রাউজানে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির মাশুল গুনতে হচ্ছে স্থানীয় দরিদ্র মানুষকে।

পাহাড় কাটার পেছনে কারা?

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং কিছু অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশেই পাহাড় কাটা ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন আবাসন কোম্পানি ও প্রভাবশালী চক্র পাহাড়ি জমি সমতল করে আবাসিক প্লট হিসেবে বিক্রি করছে। শহরের দক্ষিণ খুলশী, জালালাবাদ হাউজিং, বেভারলি হিল, সমবায় আবাসিক এলাকা, নন্দন হাউজিং, শাপলা হাউজিং ও চৌধুরী এস্টেটের মতো এলাকাগুলো পাহাড় কেটে সমতল করেই গড়ে উঠেছে।

শুধু ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধেও পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠেছে। গবেষণা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) ভিআইপি হাউজিং, লেক সিটি হাউজিং ও কোবে হাউজিংয়ের মতো আবাসিক প্রকল্পের জন্য পাহাড় কেটেছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিট নির্মাণ (চীনা অর্থায়নে), পরিবেশ অধিদফতরের নিজস্ব ভবন নির্মাণ, রেলওয়ের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ফৌজদারহাট-বায়েজিদ বোস্তামী সংযোগ সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া চন্দ্রনগর, আকবরশাহ, খুলশী ও শেরশাহ বাংলাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর ঘন বনাঞ্চল উজাড় করে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে। এতে মারাত্মক পরিবেশগত ও মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসে প্রায় ৪০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

জানা গেছে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য আগে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা তহবিল আসত। তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান সঙ্কুচিত হওয়ার পর সহায়তা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ক্যাম্পগুলোতে- দেখা দিচ্ছে অপুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মেরামত করতে না পারায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া ও টেকনাফের সহকারী বন সংরক্ষক মো: মনিরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকাটি ট্রিপল আরসি দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সেখানে বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। পাহাড়ধসের প্রধান কারণ হলো- আশ্রয়কেন্দ্র বানাতে গিয়ে সম্পূর্ণ বনাঞ্চল কেটে ন্যাড়া করে ফেলা। গাছের শিকড় মাটির গাঠনিক স্থায়িত্ব ধরে রাখে। গাছ না থাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিতে মাটি সরে গিয়ে ধস নামছে।

তিনি আরো জানান, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ও মাটি ধরে রাখতে স্থানীয় বৈলাম, গর্জন, তেলসুর ও সিভিটের মতো দেশীয় প্রজাতির গাছ অত্যন্ত উপযোগী। সেখানে নিয়মিত পুনর্বনায়ন ও গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও পাহাড় কাটার কারণে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, অর্থায়ন ৫০ শতাংশের মতো কমে যাওয়ায় সার্বিক ব্যবস্থাপনায় টান পড়েছে। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ধসে প্রাণহানির পরিবেশগত সঙ্কট কাটাতে সবচেয়ে বড় সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসন। পাশাপাশি প্রতি বছর ক্যাম্প এলাকায় বিপুল পরিমাণ বৃক্ষরোপণ করা হলেও ভৌগোলিক বাস্তবতা ও মানুষের চাপের কারণে পাহাড় ক্ষয় ঠেকানো কঠিন হচ্ছে।’

গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘পাহাড় কখনো অবাধ বসতির স্থান হতে পারে না। বাণিজ্যিক স্বার্থ, আবাসন প্রকল্প, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মাটি বিক্রির কারণে চট্টগ্রাম শহর একের পর এক পাহাড় হারাচ্ছে। খাড়াভাবে কেটে ফেলা পাহাড়গুলো বর্ষায় প্রচুর পানি শোষণ করে ভারী হয়ে ধসে পড়ে। যেহেতু নিম্ন আয়ের মানুষ পাহাড়ি ঢালে বাস করে, তাই প্রাণহানির শিকারও হন তারা।’

তিনি ২০০৭ সালের ১১ জুনের স্মরণীয় পাহাড়ধসে ১২৭ জন এবং ২০১২ সালের ২৬ জুনের পাহাড়ধসে ৯০ জনের বেশি মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

ড. মোর্শেদ আরো বলেন, ‘চট্টগ্রামের পাহাড়ি মাটি বালুকাময় হওয়ায় তা সহজেই ক্ষয়ে গিয়ে ড্রেন ও খাল ভরাট করে ফেলে। ফলে সৃষ্টি হয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা। তা ছাড়া পাহাড় ধ্বংস হওয়ায় বিলুপ্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদজাত, বাড়ছে অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা। জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি- দুটোই পাহাড় ধ্বংসের কুফল।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বর্তমান পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোর মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকির অভাব রয়েছে। পাহাড় মহান সৃষ্টিকর্তার এক অনুপম দান, যা কেটে ফেললে আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। পাহাড় কাটার কারণে ড্রেন ভরাট হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে এবং আবহাওয়া চরম ভাবাপন্ন হচ্ছে।’

তিনি অতি দ্রুত পাহাড় রক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন ‘পাহাড় রক্ষা কমিশন’ গঠনের জোর দাবি জানান।