র‌্যাব-১৫ সিও’র বিরুদ্ধে ইয়াবা ও অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • একযোগে ৩ শতাধিক বদলির বিষয়ে যা জানাল র‌্যাব
  • কক্সবাজারে আত্মীয়ের ভ্রমণ খরচ প্রায় অর্ধকোটি টাকা

কক্সবাজার ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-১৫ (র‌্যাব-১৫)-এ কর্মরত অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানসহ তিন শতাধিক সদস্যকে একযোগে বদলি করা নিয়ে নানা গুঞ্জন উঠেছে।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, র‌্যাব-১৫ অধিনায়ক বা সিও কামরুল হাসান ও তার ঘনিষ্ঠ লোকজন সেখানে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্য গড়ে মাদকের একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিও এবং তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা ইয়াবা উদ্ধার করে মামলায় কম দেখানো, আর্থিক অনিয়ম ও কয়েকটি বিতর্কিত অভিযান করে নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন। এমনকি সিওর আত্মীয়স্বজন কক্সবাজারে ঘুরতে যাওয়া এবং হোটেলে থাকা খাওয়ার খরচ সবই বহন করা হয়েছে ব্যাটালিয়ন থেকে। এ জন্য গত এক বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যা বর্তমানে র‌্যাবের বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়াও আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব কক্সবাজার, টেকনাফ এবং বান্দরবানে ভ্রমণের জন্য র‌্যাবের গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। লে. কর্নেল কামরুল হাসানের এসব অপকর্ম থেকে বাঁচতে তার নিচের পদের কর্মকর্তাদের ফাঁসানোর জন্য নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়ার বিষয়টিও তদন্ত চলছে।

এসব অভিযোগ নিয়ে র‌্যাব সদর দফতর তদন্তের পর এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি বলে র‌্যাবের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ওই সূত্র জানিয়েছে, নানা বিতর্কিত ও ইয়াবা জব্দ নাটকীয়তা এবং অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনার পরও র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (অপস) নির্দেশনায় লে. কর্নেল কামরুল হাসানকে বাহিনীতে ফেরত না পাঠিয়ে র‌্যাব সদর দফতরের পরিচালক (কমিউনিকেশন) পদে বহাল রাখা হয়।

র‌্যাব সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে ১৯৮ সদস্য এবং একই তারিখে আরেকটি প্রজ্ঞাপনে আরো ২০০ সদস্যকে বদলি করা হয়। এরপর ২৭ নভেম্বর তৃতীয় দফায় আরো ৭৪ সদস্যকে বদলি করা হয়। এসব প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিন দফায় যাদের বদলি করা হয়েছে তাদের মধ্যে তিন শতাধিক সদস্যই র‌্যাব-১৫ এ কর্মরত ছিলেন। ফলে এক ইউনিট থেকেই এত বৃহৎ সংখ্যক সদস্যকে সরিয়ে নেয়া সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ইয়াবা ও অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগটির বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে যারা দোষী হবেন তারা বিধি অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আসবেন। যারাই র‌্যাবে থেকে অন্যায় করবে তাদের ব্যাপারে র‌্যাব জিরো টলারেন্স। তবে এই অভিযোগে র‌্যাব-১৫ থেকে একযোগে তিন শতাধিক সদস্যকে প্রত্যাহারের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কারণ সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। র‌্যাবের এই বদলির বিষয়টিও সরকারের নির্দেশনায় হয়েছে। কারণ অনেক ব্যাটালিয়নে জনবল কম। এ ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে লোকবল বাড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে ইয়াবা আত্মসাৎ, অনিয়ম ও তথ্য বিভ্রাট নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও র‌্যাবের মিডিয়া উইং জানিয়েছে, তদন্ত চলমান এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে।

জানা গেছে, এক বছর র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসানকে সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নেয়ামুল হালিম খান, যিনি করোনাকালে যশোর সেনানিবাসের ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের ৩৭ বীরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এ দিকে র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, লে. কর্নেল কামরুল হাসান এবং তার স্ত্রী-সন্তানের যাবতীয় খরচ বহন করা হতো ব্যাটালিয়ন থেকে। এ ছাড়াও শ্বশুরবাড়ি। আত্মীয় স্বজন, বন্ধবান্ধবদের যেসব হোটেলে রাখা হয়েছে তাদের খাদ্য, ফুল, ফল বিভিন্ন গিফটের অর্থ ব্যয় করা হতো ওই ব্যটালিয়নের অর্থে। এ ছাড়া যাতায়াত এবং ভ্রমণের জন্য র‌্যাবের গাড়ি ব্যবহার করা হতো।

র‌্যাব সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বাস্তবে সাম্প্র্রতিক মাসগুলোতে র‌্যাব-১৫ কে ঘিরে বেশ কিছু অভিযোগ ওঠার পর সদর দফতরে বিশেষ তদন্ত শুরু করে। এই তদন্তে দু’টি আলোচিত অভিযানকে কেন্দ্র করে গুরুতর অসঙ্গতি বেরিয়ে আসে, যার পরিপ্রেক্ষিতেই গণবদলির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

গত ৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং পশ্চিম পাড়ায় অভিযানে দুই নারীকে ৮৯ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ আটক দেখায় র‌্যাব-১৫। উদ্ধার দেখানো হয় আরো ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৮৩০ টাকা। তবে অভিযোগ ওঠে, প্রকৃত ইয়াবার পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল এবং প্রায় এক লাখ ১০ হাজার ইয়াবা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেই সাথে মামলায় স্থানীয় যুবদল নেতা হেলাল উদ্দিনের সহযোগী সেলিম উদ্দিনের নাম ‘ভুল তথ্য দিয়ে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্থানীয় সাংবাদিক সেলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, একজন মাদক কারবারি সেলিমকে রক্ষা করতে নামের মিল ব্যবহার করে তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নভেম্বরের শুরুতে র‌্যাব সদর দফতরের একটি তদন্ত দল সরেজমিন পরিদর্শনে যায় বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন।

এ ছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকায় আরেকটি অভিযানে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করার পর র‌্যাব-১৫ তার কাছ থেকে ৭টি ইটের টুকরা ও ২টি কাঠের লাঠি উদ্ধার দেখায়। এই অস্বাভাবিক জব্দতালিকা স্থানীয়ভাবে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করে। দু’টি অভিযানের নেতৃত্বেই ছিলেন তৎকালীন র‌্যাব-১৫ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুল হাসান। আর তার ঘনিষ্ঠ টেকনাফ এফএস কমান্ডার করপোরাল ইমামকে এসব বিতর্কিত অভিযানের মূল নেপথ্য ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে র‌্যাবের একাধিক সূত্র।