বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলটি এক গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত শুক্রবার তার রূহের মাগফিরাত কামনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দোয়া মাহফিল। আবেগঘন এই সময় পার করেই বিএনপি এখন পুরোপুরি মনোযোগ দিচ্ছে সামনে থাকা জাতীয় নির্বাচনের দিকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দলের সব প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনিও শোক কাটিয়ে দলীয় কাজে সম্পূর্ণ মনোযোগী হতে শুরু করেছেন।
জানা গেছে, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় গুলশান কার্যালয়ে এসে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তারেক রহমান। এ সময় তিনি সাংগঠনিক এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে খোঁজখবর নেন। সকালের দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও কার্যালয়ে ছিলেন। তার সাথেও বেশ কিছু ইস্যুতে কথা বলেন তারেক রহমান।
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক চাপ, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব সঙ্কটে ভুগেছে বিএনপি। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা ও তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর সেই স্থবিরতা কাটতে শুরু করলেও খালেদা জিয়ার মৃত্যু দলটির জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে দলকে এক সুতোয় বেঁধে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে দেশের কল্যাণে কাজ করাই এখন বিএনপির প্রধান লক্ষ্য।
দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্লান’। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এই বক্তব্য নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনার ঘোষণা যথেষ্ট নয়- সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে তারেক রহমানকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ভেতরে গ্রুপিং, কোন্দল ও নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলপর্যায়ে আস্থার সঙ্কট এখনো কাটেনি। নির্বাচনী সময়ে এসব অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে সাংগঠনিক দুর্বলতা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ হলেও এটি নতুন সঙ্কট তৈরি করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, বহু জেলায় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে প্রার্থীরা বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছেন। কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বিদ্রোহ দমন ও সমঝোতার মাধ্যমে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্য গড়ে তোলাও তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা। দলীয় নেতারা বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে কিছু কিছু আসনে নির্বাচনী ফল বিপর্যয়ের দিকে যেতে পারে। তাই কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কৌশল নিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠন। এজন্য আগামীতে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি ইতিবাচক কী কী করবে তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের সামনে একটি স্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরাও জরুরি। সরকার পরিবর্তনের স্লোগানের বাইরে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা কী- তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্লান’ বক্তব্যের বাস্তব রূপ দেখতে চায় ভোটাররা। নির্বাচনী মাঠে সরাসরি নামার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন তারেক রহমান। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান নিজেই নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নেবেন এবং নেতাকর্মীদের মাঠে কাজ মনিটর করবেন। এর মাধ্যমে তিনি দলকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে একটি ‘পজিটিভ হাইপ’ তৈরি করতে চান।
ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে জনমত গড়ে তোলাই এখন বিএনপির প্রধান কৌশল। নেতারা বলছেন, নেতিবাচক রাজনীতির বদলে ইতিবাচক বার্তা, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেই ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চান তারেক রহমান। বিএনপির সামনে নির্বাচনী আচরণ ও রাজনৈতিক কৌশলও বড় চ্যালেঞ্জ বলে অনেকে মনে করেন। প্রতিপক্ষের সমালোচনা মোকাবেলায় সংযত ভাষা, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সাথে দায়িত্বশীল আচরণ এবং সহিংসতা এড়িয়ে চলা- এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে দলীয় নেতৃত্বকে।
দলের নেতারা বলছেন, আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অতীতে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব ছিল বলে মনে করেন কেউ কেউ । নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা অর্জনে ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী অবস্থান নিতে হবে তারেক রহমানকে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানের সামনে সময় কম, কিন্তু দায়িত্ব অত্যন্ত বড়। শোক কাটিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, বিদ্রোহী প্রার্থী সামাল দেয়া, নেতিবাচক ভাবমূর্তি বদলানো এবং জনগণের আস্থা অর্জন সব চ্যালেঞ্জ একসাথে মোকাবেলা করতে হবে তাকে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে সামাল দিতে পারলে তারেক রহমান শুধু বিএনপির নেতা হিসেবেই নয়, বরং দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের প্রধান দায়িত্ব হলো দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আদর্শে ফিরে যাওয়া এবং তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা দূর করা।
মায়ের মৃত্যুর পর ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান বলেছেন, তিনি বেগম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত রাজনৈতিক মিশন এগিয়ে নেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই আবেগী অঙ্গীকারকে বাস্তব রাজনৈতিক রূপরেখায় রূপ দিতে পারলেই তার নেতৃত্ব দৃঢ় হবে।



