নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ছাত্র সংসদের প্রতি জাতির অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। ডাকসু, জাকসু, চাকসু, রাকসুর মতো আগামী বাংলাদেশও তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে। তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশ আমাদের সবার কাম্য। তিনি আরো বলেন, তরুণরা কেমন বাংলাদেশ গড়বে, তার প্রমাণ দিচ্ছে এই ছাত্র সংসদগুলো। আমাদের বিশ্বাস, তোমাদের হাত ধরেই এই জাতির ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তোমাদেরকে জাতির স্বপ্নসারথি হতে হবে।
গতকাল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে ‘দুর্বার নেতৃত্বে গড়ি স্বপ্নের ক্যাম্পাস’ প্রতিপাদ্যে দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, দীর্ঘদিন পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বহু বছর ধরে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ ছিল অপ্রাসঙ্গিক। শুধু ছাত্র সংসদ নয়, পুরো বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থাই ছিল অচল। আমি সবাইকে অভিনন্দন জানাই। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেকে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক এক্সেলেন্স, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা ও সততার পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করবে। গতানুগতিক কালচারের বাইরে এসে ভবিষ্যতের বৃহৎ নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। তোমাদের নেতৃত্বে যেমন জগদ্দল পাথর সরিয়ে দিয়েছ, তেমনি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে সহযোগিতা করবে।
সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছিল ছাত্রসমাজের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত। এটি ছিল জুলাই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। ইসলামী ছাত্রশিবির বরাবরই ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে সোচ্চার থেকেছে ও আন্দোলন করেছে। তিনি বলেন, ছাত্র সংসদ শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ হবে না, বরং এটি হবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ট্রেনিং গ্রাউন্ড। এই নেতৃত্বই আগামী দিনে দেশের গতিপথ ও নীতিনির্ধারণ করবে। প্রতিনিধিরা কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতিনিধি নয়; বরং সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সবার জন্য কাজ করবে। সব ক্যাম্পাসে ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি থাকতে হবে। প্রত্যেক প্রতিনিধিকে সবার নেতা হয়ে উঠতে হবে।
তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, আমরা তখনো পুরনো ব্যবস্থায় আটকে আছি। বিশ্বের বিভিন্ন ছাত্র সংসদ সম্পূর্ণ শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক। আমরাও এমন শিক্ষার্থীবান্ধব ছাত্র সংসদ চাই, যা বৈচিত্র্যময় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে মডেল হয়ে উঠবে। জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার চর্চা করতে চাই না, বরং একে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে চাই। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চাই। তিনি বলেন, ছাত্রশিবির মনে করে, ছাত্রবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি জাতীয় সঙ্কটের মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে হবে।
ছাত্রশিবির সভাপতি তার বক্তব্যে জুলাই শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের অবদান স্মরণ করেন এবং ডাকসু নির্বাচনের খবর সংগ্রহের সময় স্ট্রোক করে মারা যাওয়া সাংবাদিক তারিকুল ইসলাম শিবলী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় মৃত্যুবরণ করা শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌসের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এবং সাবেক চাকসু ভিপি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার। ছাত্রসংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তৃতা করেন, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জাকসু ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি, রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, জাকসুর এজিএস আয়শা সিদ্দিকা মেঘলা এবং রাকসুর নির্বাহী সদস্য সুজন চন্দ্র। আরো বক্তৃতা করেন, ফ্যাসিবাদী আমলে গুম হওয়া ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান, জুলাই শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্তর মা কোহিনূর আক্তার, জুলাইযোদ্ধা তাহমিদ হুজায়ফা, জাগপা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুর রহমান ফারুকী, ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা এবং খেলাফত ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল আজিজ।
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, জুলাই আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীরা, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতিবৃন্দ, বন্ধুপ্রতিম ছাত্রসংগঠনের সভাপতিবৃন্দ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইসলামিক স্কলার, কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েট সদস্যবৃন্দ, চার বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আদায়ে ছাত্রশিবির ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকা শীর্ষক ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে সম্মাননা স্মারক, ফুল, ক্রেস্ট ও বই তুলে দেয়া হয়।
জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সবাই নিরাপদে থাকবে : অধ্যাপক মুজিবুর
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির, সাবেক এমপি ও রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছেন, আগামীর বাংলাদেশ গড়ার জন্য সব ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে সবাই নিরাপদে থাকবে। প্রতিটি ধর্মই তার অনুসারীদের নৈতিক ও চারিত্রিকভাবে উন্নত নাগরিক হওয়ার শিক্ষা দেয়। কোনো ধর্মই ন্যায্যতার প্রশ্নে আপস করে না। তাই ন্যায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঠাকুর যৌবন গ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষদের নিয়ে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পরে যেসব দল বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল তারা কেউ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভাইবোনদের মৌলিক চাহিদার দিকে নজর দেয়নি। বরং তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে উপজাতিসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভাইবোনদের সর্ব প্রকার ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হবে।
উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়ন আমির জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আব্দুল খালেক, জেলা কর্মপরিষদের সদস্য ড. মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ্, গোদাগাড়ী উপজেলা আমির নুমায়ন আলী, সেক্রেটারি হাফিজুর রহমান, উপজেলা কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, কাঁকনহাট পৌরসভার আমির মাওলানা নজরুল ইসলামসহ বিভিন্নপর্যায়ে নেতৃবৃন্দ।
খুলনায় জামায়াতের ৭ নভেম্বরের আলোচনা সভা
খুলনা ব্যুরো জানায়, জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগরী শাখা ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল দলীয় অফিসে এক আলোচনা সভা করে। মহানগরী আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের পরিচালনায় সভায় বক্তৃতা করেন নায়েবে আমির অধ্যাপক নজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহ আলম, প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, ড. আবু রুবাবা, মাওলানা আ ন ম আব্দুল কুদ্দুস, মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক, আ স ম মামুন শাহীন, হাফেজ মুকাররম বিল্লাহ আনসারী প্রমুখ।
মহানগরী আমির বক্তৃতায় বলেন, এ জাতি প্রতি পরীক্ষার পর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একটা নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা, নতুন দিগন্ত আল্লাহ তায়ালা সূচনা করেছেন। এবারের ৭ নভেম্বর আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে এমন একটা সময়ে উদযাপন করছি যখন আধিপত্যবাদ বিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাই ঐক্যবদ্ধ। ৭ নভেম্বরের চেতনা ও ছাত্র-জনতার ৫ আগস্টের বিপ্লব এক সূত্রে গাঁথা।



