৩শ’র পরিবর্তে ৯০০ খাতা দেখছেন পরীক্ষকরা

শিক্ষকের মেজাজ মর্জিতে ঝুলছে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভাগ্য

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

পরীক্ষার উত্তরপত্রে ভালো ও সঠিক উত্তর লিখলেও আশানুরূপ ফল আসছে না। আবার উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করেও শুধু নম্বর গণনা ছাড়া উত্তরপত্র দ্বিতীয়বার মূল্যায়নেরও কোনো সুযোগ নেই। ফলে একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ণ করে পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র যে নম্বর দেন মূলত সেটিই চূড়ান্তভাবে ভাগ্য নির্ধারণ করে একজন শিক্ষার্থীর। চলতি বছরের এসএসসির একটি বিষয়ের উত্তরপত্র মূল্যায়নে যে অবাক করা তথ্য প্রকাশ পেয়েছে তাতে প্রত্যেক পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের মধ্যে এখন থেকেই চরম হতাশা আর দুশ্চিন্তারও যথেষ্ট কারণ দেখা দিয়েছে। কেননা খোদ শিক্ষা বোর্ড সূত্রই জানিয়েছে বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য একজন শিক্ষক ৩০০ খাতার পরিবর্তে অতিরিক্ত ভাতা পাওয়ার আশায় নিয়েছেন ৯০০ খাতা। আর মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে এই ৯০০ খাতা নিয়ে মূল্যায়ন করে ইতোমধ্যে প্রধান পরীক্ষকের কাছে জমাও দিয়ে দিয়েছেন। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় শিক্ষকের খাতা দেখা বা তার মেজাজ মর্জির ওপরেই নির্ভর করছে এসএসসির ফল প্রত্যাশির ভাগ্য।

একজন শিক্ষকের জন্য যেখানে শিক্ষা বোর্ড থেকেই মাত্র ৩০০ খাতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে মূল্যায়নের জন্য। আর এই খাতা মূল্যায়নের জন্য প্রত্যেক শিক্ষককে বোর্ড নির্ধারিত ১৫ দিন সময়ও বেঁধে দেয়া হয়েছে। তবে এবারের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং এ সংক্রান্ত নানা অসঙ্গতিও ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এর আগে এসএসরি উত্তরপত্র বহনের ব্যাগে পুরাতন কাগজের আড়ালে প্রকৃত অর্থে কোনো উত্তরপত্র বাইরে নিয়ে নেয়া হয়েছে কিনা তা নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এবার নতুন করে পরীক্ষকদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সক্ষমতা বা তাদের নির্ধারিত উত্তরপত্রের বাইরে আরো তিনগুণ দ্বিগুন খাতা দেখার বিষয়টি নিয়েও সবার মধ্যেই উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

অপর দিকে বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে এবার ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। প্রথম দিকে বারবার তাগিদ দিয়ে পরীক্ষকদের খাতা নেয়ার জন্য বোর্ডে আনতে পারেনি কর্মকর্তাগণ। বিশেষ করে বাংলা প্রথমপত্র খাতা নির্ধারিত সময়ের অনেক পরেই বোর্ড থেকে সংগ্রহ করেছেন অনেক পরীক্ষক। দুই দফা তাগিত এমনকি শেষ পর্যায়ে অনেকটা শোকজ বা হুমকি দিয়েই শিক্ষকদের বোর্ড থেকে খাতা নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ফলে ঐ সব উত্তরপত্র মূল্যায়নেও বেশ কিছু ত্রুটি থাকার আশঙ্কাও রয়েই গেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, বেশ কয়েকজন পরীক্ষক তাদের জন্য নির্ধারিত ৩০০ খাতার পরিবর্তে একেক জন ৬০০ আবার কেউ কেউ ৭০০, আবার অনেকে ৯০০ খাতাও নিয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে একজন পরীক্ষক কিভাবে এই ৯০০ খাতা দেখে শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করছেন ?

এ দিকে কয়েকজন পরীক্ষক তাদের তথ্য গোপন করে এসএসসির অতিরিক্তি খাতা নিয়ে তা অল্পসময়ের মধ্যে নামকাওয়াস্তে মূল্যায়ন করে সেই উত্তরপত্র আবার জমাও দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য বিষয়টি জানাজানি হলে অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। বিষয়টি গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানু স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি চিঠিতে জানানো হয়েছে। সূত্র জানায়, শোকজ পাওয়া দুই শিক্ষক হলেন- নরসিংদী মাধবদী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক মো: মনির হোসেন ও রাজবাড়ীর লাড়ীবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক মো: খোরশেদ আলম।

মো: মনির হোসেনকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি ১ম পত্র (বিষয় কোড-১০৭)-এর পরীক্ষক মো: মনির হোসেন, পরীক্ষক কোড-২৫০২, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে অনৈতিকভাবে ও তথ্য গোপন করে একজন পরীক্ষকের জন্য নির্ধারিত ৩০০ উত্তরপত্রের জায়গায় ৪৫০ উত্তরপত্র গ্রহণ করেছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা মূল্যায়ন করে প্রধান পরীক্ষককে হস্তান্তর করেছেন।

অন্য দিকে মো: খোরশেদ আলমকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার বাংলা ২য়পত্র (বিষয় কোড-১০২)-এর পরীক্ষক খোরশেদ আলম, পরীক্ষক কোড- ২০৬৯, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে অনৈতিকভাবে ও তথ্য গোপন করে একজন পরীক্ষকের জন্য নির্ধারিত ৩০০ উত্তরপত্রের জায়গায় ৯০০ উত্তরপত্র গ্রহণ করেছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা মূল্যায়ন করে প্রধান পরীক্ষককে হস্তান্তর করেছেন।

অবশ্য এর আগে গত সোমবার একই অভিযোগে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: আ: রশিদ মিয়াকে শোকজ করেছে বোর্ড। তিনি এসএসসি পরীক্ষার বাংলা দ্বিতীয় পত্র (বিষয় কোড-১০২)-এর পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার পরীক্ষক কোড-২৪৬০। তিনি নির্ধারিত ৩০০ খাতার স্থলে ৭০০ খাতা নিয়েছিলেন।

ঢাকার একজন অভিভাবক গতকাল এই প্রতিবেদককে জানান, এবারের এসএসসির উত্তরপত্র নিয়ে যেভাবে প্রথম থেকেই হ য ব র ল দেখা দিয়েছে তাতে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও অজানা আশঙ্কায় থাকবে। কেননা সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন না হলে অনেকে হয়তো তাদের কাক্সিক্ষত ফলাফল না পেতে পারেন।

আর এই দায় কে নেবে সেটি পরিষ্কার হচ্ছে না। কেননা শিক্ষাবোর্ড শুধু শোকজ আর নির্দেশনা দিয়েই তাদের দায় এড়াতে চাইছে। প্রকৃত অর্থে সঠিক সমাধান বা শিক্ষার্থীদের সঠিক মূল্যায়নের বিষয়ে কিন্তু এখনো কেউ দায়িত্ব নিয়ে কথা বলছেন না।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র নয়া দিগন্তকে জানায়, বোর্ডে এখন চলছে পদোন্নতি আর চেয়ার দখলের খেলা। কে কাকে ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে গিয়ে পদোন্নতি নেবেন সেই বিষয়েই সবাই উদগ্রীব।

প্রকৃত অর্থে শুরু থেকেই যদি এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া হতো তাহলে কিন্তু এই উত্তরপত্রের এই বেহাল দশা বা মূল্যায়নের এই অবহেলা থাকত না। সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় কেউই কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না। সবাই যে যার স্বার্থ আর পদোন্নতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত ।

অবশ্য শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে গাফিলতি করলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। ইতোমধ্যে সব পরীক্ষককে এ বিষয় সতর্ক করা হয়েছে। আর অভিযুক্ত কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না তার জবাব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে।