অনলাইন ব্ল্যাকমেইলিংয়ের নতুন অস্ত্র ডিপফেক প্রযুক্তি

ছবি ও কণ্ঠ নকল করে চলছে ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে একই সাথে তৈরি করেছে নতুন ধরনের সাইবার ঝুঁকি। বিশেষ করে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি ও সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও যা কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে করা হতো, এখন তা বাস্তব অপরাধ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

হারুন ইসলাম
Printed Edition
  • ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহারে বাড়ছে
  • সাইবার অপরাধ ও নারীর নিরাপত্তা ঝুঁকি
  • বাড়ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে একই সাথে তৈরি করেছে নতুন ধরনের সাইবার ঝুঁকি। বিশেষ করে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি ও সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও যা কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে করা হতো, এখন তা বাস্তব অপরাধ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কোনো ব্যক্তির মুখমণ্ডল, কণ্ঠস্বর বা অভিব্যক্তি হুবহু নকল করে নতুন ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি করা হয়। প্রথম দিকে চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, অডিওবুক ও গবেষণার কাজে প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে অপরাধীরা এটি ব্যবহার করছে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিং ও গুজব ছড়ানোর কাজে।

সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ডিপফেক তৈরির জন্য এখন আর উন্নত প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন হয় না। অনলাইনে সহজলভ্য বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করেই কয়েক মিনিটে বাস্তবসম্মত ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি করা সম্ভব। অপরাধীরা সাধারণত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে। এরপর সেই তথ্য দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা হয়।

ডিপফেকভিত্তিক অপরাধের অন্যতম ভয়াবহ দিক হলো কণ্ঠস্বর নকল বা ভয়েস ক্লোনিং। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও নমুনা ব্যবহার করেই এখন কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর হুবহু অনুকরণ করা সম্ভব। এরপর সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে জরুরি অর্থ সহায়তার আবেদন জানানো হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা বেশ বেড়েছে। হংকংয়ে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকর্তা ভিডিও কনফারেন্সে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেখতে ও শুনতে পান। পরে জানা যায়, ভিডিও কলে উপস্থিত অন্য সবাই ছিল এআইনির্ভর ডিপফেক চরিত্র। ওই ঘটনায় প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা। অর্থ স্থানান্তরের জন্য মোট ১৫টি লেনদেন করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) জানিয়েছে, গত বছর এআই-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের প্রতারণায় দেশটির নাগরিকেরা ৮৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন। এসব প্রতারণার মধ্যে ছিল ভয়েস ক্লোনিং, এআই দিয়ে তৈরি ফিশিং-ইমেইল, ভুয়া প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রতারণা।

বিশ্বব্যাপী আলোচিত আরেক ধরনের প্রতারণা হচ্ছে ‘হাই মাম’ বা ‘হাই ড্যাড’ স্ক্যাম। এতে অপরাধীরা হোয়াটসঅ্যাপে নতুন নম্বর থেকে বার্তা পাঠিয়ে নিজেদের সন্তান বা পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। একপর্যায়ে এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে জরুরি অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা কণ্ঠ শুনে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেক মুরের মতে, বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া অডিও ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডেই বাস্তবসম্মত কণ্ঠ তৈরি করা সম্ভব।

এ দিকে প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেও নতুন ধরনের প্রতারণা বাড়ছে। আকর্ষণীয় চেহারার ভুয়া ছবি তৈরি করে ডেটিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল খোলা হয়। এরপর দীর্ঘদিন যোগাযোগের মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ডিপফেক ভিডিওকলের মাধ্যমে সম্পর্ককে বাস্তব বলে বিশ্বাস করানো হয়। পরে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে শুরু হয় ব্ল্যাকমেইলিং। অর্থ না দিলে সেসব তথ্য প্রকাশের হুমকি দেয়া হয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ডিপফেকের অপব্যবহার দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা জনপরিচিত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া অডিও ও ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ছে।

দেশে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ভুল তথ্য ও ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যের ব্যাপক বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণেও। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এই তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫৬টি অপতথ্যই ছিল রাজনৈতিক। আবার সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য, যার সংখ্যা ৬৫১টি। এরপর রয়েছে তথ্যভিত্তিক ভুল তথ্য ৫৫০টি ও ছবিভিত্তিক ভুল তথ্য ২৪৫টি।

রিউমর স্ক্যানার বলছে, প্রকৃতির দিক থেকে এগুলোর মধ্যে সরাসরি মিথ্যা ছিল ১ হাজার ৫১টি, বিকৃত তথ্য ২৫৩টি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ১৩২টি, আংশিক মিথ্যা ৩টি ও আংশিক সত্য ২টি। এতে বোঝা যায়, যাচাইহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সরাসরি মিথ্যাই এ সময়ে অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার ছিল।

ডিসমিসল্যাবের ৬ জানুয়ারির এক প্রতিবেদন বলছে, ১৬ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের ৯টি ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা নির্বাচনসংক্রান্ত ৬৩টি মিথ্যা দাবি শনাক্ত ও খণ্ডন করেছে। এর আগে ১৬ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৫০টি, অর্থাৎ মিথ্যা দাবি প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে মিথ্যা বিবৃতি ও উক্তি।

মূলত নারীরা এ ধরনের অপরাধের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি, ভিডিও ও ভয়েস ক্লিপ সংগ্রহ করে অপরাধীরা ভুয়া ভিডিও বা অডিও তৈরি করছে। এরপর সেগুলো প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। এতে ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ রকমই ডিপফেক হয়রানির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে ঝিনাইদহ ও টাঙ্গাইলের ঘটনাতে। গত বছরের নভেম্বরে ঝিনাইদহে এক কলেজছাত্রী ইনস্টাগ্রামে বন্ধুত্বের অনুরোধ পেয়ে প্রতারণার শিকার হন। তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও বানিয়ে হয়রানি করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় ৮ স্কুলছাত্রীসহ ১৩ জনের ছবি দিয়ে ভুয়া পর্নো ভিডিও তৈরি করে অর্থ দাবি করা হয়। এক ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, টাকা না পেয়ে পরে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দেয়া হয়। দু’টি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানা ও পিসিএসডব্লিউতে অভিযোগ করেন। তদন্তে প্রথম ঘটনায় প্রতিবেশী এক তরুণ এবং দ্বিতীয় ঘটনায় এক কিশোরী সহপাঠীকে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ তাদের আটক করে।

২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইউনিটটির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ৪৩ হাজারের বেশি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরো বেশি। ভয়, সামাজিক লজ্জা এবং সচেতনতার অভাবে অনেক নারী অভিযোগই করেন না বলে মনে করছেন তারা।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ জানিয়ে ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছে কমিশন।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক ডা: শাহানা পারভীন বলেন, নিয়মিত অনলাইন যৌন হয়রানি বা হুমকি দীর্ঘস্থায়ী ভয়ের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। অনেক নারী মোবাইল ব্যবহার করতেও ভয় পান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এড়িয়ে চলেন।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পরামর্শ, অর্থসংক্রান্ত কোনো অনুরোধ এলে শুধু ভিডিও কল বা ভয়েস মেসেজের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটি গোপন সঙ্কেত বা কোডওয়ার্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে সেটি ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর অপ্রয়োজনে প্রকাশ না করাই ভালো। সব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) চালু করা উচিত। সন্দেহজনক ভিডিও বা অডিও পেলে তা যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা যাবে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, ডিপফেকের শিকার হলে দ্রুত প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট স্ক্রিনশট, অডিও, ভিডিও ও লিংক সংরক্ষণ করে সাইবার ক্রাইম ইউনিট বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। দ্রুত অভিযোগ করা গেলে অপরাধীদের শনাক্ত করার সম্ভাবনা বাড়ে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতো, সাইবার আক্রমণ ও ডিপফেকের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচন পেছানোর উদাহরণ আছে। আমাদের দেশেও নির্বাচন কমিশন ডিপফেক ও অপতথ্যের ঝুঁকির কথা বারবার বলেছে। তবে এর বিপরীতে কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান সময়ের বাস্তব সঙ্কট। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকাতে আইনি কাঠামো, প্রযুক্তিগত সুরক্ষা এবং জনসচেতনতা একসাথে বাড়াতে হবে। অন্যথায় নারীদের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি ও সাইবার হয়রানির ঘটনা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।