কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের জামায়াত নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার। তিনি জানিয়েছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২/১ (ণ) ধারা উল্লেখ করে মনোনয়ন বাতিল করা হলেও, ২০১৩ সালের আদালত অবমাননার দণ্ড কোনো প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণে আইনত বাধা হতে পারে না।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৯ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ১১/৪ ধারা অনুযায়ী তাকে আদালত অবমাননার অভিযোগে শাস্তি দেয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ তোলা হলেও, তৎকালীন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী হিসেবে আমি দেখেছি যে ওই শাস্তি প্রার্থী হওয়ার পথে বাধা হয়নি।
প্রসিকিউটর সাত্তার এই বিষয়ে তিনটি প্রধান আইনি পয়েন্ট উল্লেখ করেন : (ক) সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ : সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ‘নৈতিক স্খলনজনিত’ কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ন্যূনতম দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তবেই তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হবেন। হামিদুর রহমানের আদালত অবমাননার সাজা এই সংজ্ঞায় পড়ে না। (খ) দালাল আইন ১৯৭২: ১৯৭২ সালের দালাল আইনের আওতায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও নির্বাচনে অযোগ্য। তবে আযাদকে এই আইনের অধীনে কোনো দণ্ড দেয়া হয়নি।
(গ) আইসিটি অ্যাক্ট সেকশন ৩/২: এই ধারায় নির্দিষ্ট করে বলা আছে কোন কোন অপরাধের জন্য একজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। আদালত অবমাননার বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত না। এটি সেকশন ১১/৪ এর অন্তঃভোক্ত। যেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে অপরাধ নয়। ফলে আইপিও ১২/১ (ণ) ধারা দোহাই দিয়ে তার মনোনয়ন বাতিলের বিষয়টি সম্পন্ন বেআইন হয়েছে। যেটা আপিল করলে রিটার্নিং অফিসারের আদেশটি বাতিল হয়ে যাবে।
তিনি আরো স্পষ্ট করেন যে, ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, যদি কারো বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ‘ফরমাল চার্জ’ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) গঠিত হয়, তবেই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাবেন। তবে হামিদুর রহমান আযাদের বর্তমান মামলার পরিস্থিতির সাথে এই নতুন বিধির কোনো আইনি সম্পৃক্ততা নেই। ফলে আরপিও-র ১২/১ (ণ) ধারার দোহাই দিয়ে তার মনোনয়ন বাতিলের বিষয়টি আইনি তর্কের অবকাশ রাখে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো: আব্দুল মান্নান।
বলা হয়েছিল, হামিদুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রয়েছে। এ মামলার তথ্য গোপন করায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি সূত্র। তবে প্রার্থিতা ফেরত চেয়ে তিনি আপিল করতে পারবেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো: আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মনোনয়নপত্রে উল্লিখিত তথ্যে গরমিল থাকায় জেলার দুই আসনে চারজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। প্রার্থীদের আপিলের সুযোগ রয়েছে।’ উল্লেখ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বিচারাধীন বিষয়ে অবমাননাকর বক্তব্য ও দেশে ‘গৃহযুদ্ধ’র হুমকি দেয়ায় আদালত অবমাননার অভিযোগে ২০১৩ সালের ৯ জুন হামিদুর রহমান, তৎকালীন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও মহানগর সহকারী সেক্রেটারি সেলিম উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
হামিদুর ও রফিকুলকে তিন মাসের কারাদণ্ড এবং তিন হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো দুই সপ্তাহের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।
আর সেলিম ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করায় তাকে এক হাজার টাকা জরিমানা এবং আদালত কার্যক্রম চলাকালে আদালতে বসে থাকার শাস্তি দিয়েছিল।
ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেছিল, পুলিশের প্রতিবেদনে রফিকুল ইসলাম খান ও হামিদুর রহমান আযাদকে পলাতক দেখানো হয়েছে। কিন্তু তারা জনসমক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ সংসদেও গেছেন। তারা ট্রাইব্যুনালে হাজির না হয়ে আদালত অবমাননা করেছেন। তাদের গ্রেফতার করার পর অথবা আত্মসমর্পণের পর থেকে এ সাজা কার্যকর হবে।
ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে জামায়াতের এক সমাবেশে এই তিন নেতা বিচারাধীন বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
মতিঝিলে জামায়াতের ওই সমাবেশে সেলিম উদ্দিন ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবেন না। সবকিছু হিসেব করে রায় দেন। তিনি বলেন, একটা রায়ই শেষ নয়। রায়ের পর রায়, এরপর বহু প্রতিক্রিয়া আছে। বিষয়টি হালকাভাবে দেখলে চলবে না। দেশকে গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচাতে হলে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল থেকে রায় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
একই সমাবেশে হামিদুর রহমান আযাদ বলেছিলেন, স্কাইপে সংলাপের গোপন তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর এ ট্রাইব্যুনাল আর এক মুহূর্তও চলতে পারে না। আর রফিকুল ইসলাম খান পরের দিন অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি প্রেস ব্রিফিংয়ে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন।
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে ৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে তাদের সশরীরে হাজির হয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বলে ট্রাইব্যুনাল।
কিন্তু এই তিন নেতার কেউই ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে জবাব না দেয়ায় ট্রাইব্যুনাল ৬ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরে সেলিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।



