সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
ইতালির মেস্ত্রে শহরের একটি পার্কে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও তাকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সোমবার রাতে ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের সাথে ওই পার্কে গেলে একদল ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন বাঁধন। তার দাবি, হামলাকারীরা তার ওপর পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে এবং তার হাত থেকে মুঠোফোন ফেলে দেয়। এ সময় তার কানের পাশেও আঘাত করা হয় বলে জানান তিনি।
ঘটনার সময় বাঁধনের ভাইয়ের শিশুসন্তানও সাথে ছিল। তার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন অভিনেত্রী। ঘটনার পর স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বিস্তারিত তুলে ধরেন বাঁধন। পরে হামলা ও হেনস্তার কয়েকটি ভিডিওও প্রকাশ করেন। প্রকাশিত ভিডিওতে কয়েকজনকে তার দিকে তেড়ে যেতে, ধস্তাধস্তি করতে এবং উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখা যায়। তাদের কয়েকজনকে বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে আখ্যা দিতেও শোনা যায়।
বাঁধনের অভিযোগ, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেয়। তার দাবি, তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বলা হয় এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার ও প্রকাশের চেষ্টা করা হয়।
ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, ‘এখানে আমি আমার ভাইয়ের পরিবারের সাথে পার্কে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের অনেক বাঙালি ভাই এসে আমাকে ফিজিক্যালি হ্যারাস করেছে। আমার শরীরে পানি, কোক ছুড়ে মেরেছে। এতে আমি একদম ভিজে যাই।’
তিনি বলেন, ‘তারা বলেছে, আমি জুলাইযোদ্ধা। ইয়েস, আই অ্যাম। আমি অবশ্যই জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি।’
বাঁধনের ভাষ্য, ‘আমার গায়ে হাত তোলা হয়েছে। আমার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেয়া হয়েছে।’
প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাঁধনের ভাইয়ের শিশুসন্তানের কথা উল্লেখ করে হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করতে শোনা যায়। এর জবাবে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের আবার বাচ্চা, ওকে জয় বাংলা বলতে হবে।’ ভিডিওতে বাঁধনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতেও কয়েকজনকে শোনা যায়।
জুলাই আন্দোলনে ভূমিকার কারণেই হামলা : বাঁধন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বাঁধন। আন্দোলনের পক্ষে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমেও কথা বলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, ওই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
হামলার পর দেয়া ভিডিওবার্তায় বাঁধন বলেন, ‘একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ হবে না।’ তার অভিযোগ, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একজন অভিনেত্রীকে এভাবে হেনস্তা করে হামলাকারীরা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
হামলাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের এই অসংলগ্ন আচরণ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল, আপনারা তা করতে পারেননি। আপনারা ভেবেছেন, এভাবে করেই হয়তো পরবর্তীকালে নিজেদের জায়গাটা ফের সুগঠিত করতে পারবেন। সেটা আমার মনে হচ্ছে না।’
ভিডিওবার্তায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কথাও উল্লেখ করেন বাঁধন। তিনি জানান, জয়ও ভেনিসে আছেন বলে তিনি জেনেছেন এবং তার কাছেও ঘটনাটি পৌঁছে দেয়ার কথা বলেন।
চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে বাঁধন
৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ইতালিতে যান বাঁধন। উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক অরিজন্তি বিভাগে স্থান পেয়েছে সিনেমাটি। ৬ সেপ্টেম্বর সালা দারসেনা থিয়েটারে এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়।
সিনেমাটির চারটি প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল ও আজমেরী হক বাঁধন।
হামলার বিষয়ে বাঁধন তার ভিডিওবার্তায় বলেন, তিনি যে সিনেমাটি নিয়ে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছেন, সেটির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের বাবা আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ছিলেন। এরপরও জুলাই আন্দোলনের পর তিনি রুবাইয়াতের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন- এ কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
জাতীয় সংসদে প্রতিবাদ: বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় জাতীয় সংসদেও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী এ ঘটনার নিন্দা জানান।
গতকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সাথে ইতালি সরকার ও দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ কী- তা জানতে চান তিনি।
এনসিপির নিন্দা : অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের নেতা সারজিস আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাঁধনের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন এবং তার ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
ছাত্রদলের প্রতিবাদ : ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা বিদেশের মাটিতে একজন নারী ও জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় একজন ব্যক্তিকে একা পেয়ে হামলা চালিয়েছে।
রাকিব বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে অভিযুক্তদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা তৈরি হয়নি। তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের ক্ষোভ: বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একাধিক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী।
অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘কিচ্ছু ঠিক হচ্ছে না! এই কর্মকাণ্ডগুলোর কোনোটাই ভালো হচ্ছে না!’ নারীর প্রতি অসম্মান, ভিন্নমতের মানুষের ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য, সহিংসতা ও নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশ আরো ভয়াবহ সঙ্কটে পড়তে পারে।
মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুলও নারী ও শিল্পীদের প্রতি মানুষের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চিত্রনায়িকা পরীমণি ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ জানান।
অভিনেত্রী সাফা কবির বলেন, একজন শিল্পী যখন দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র ও দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যান, তখন তার প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা- অপমান, হয়রানি বা আতঙ্ক নয়। রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে শিল্পীদের টেনে আনা দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, একজন শিল্পীর কণ্ঠ, সম্মান ও নিরাপত্তা কখনোই রাজনীতির মূল্য হওয়া উচিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুনও ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সাথে যুক্ত করে দেখেছেন। তার মতে, ভেনিসের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাঁধন শুধু একজন সাধারণ বাংলাদেশী নন; তিনি এক অর্থে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
‘রাজনৈতিক ছত্রছায়া না থাকায় সহজ টার্গেট’
আলোচিত উপস্থাপক দীপ্তি চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়াহীন একজন সাধারণ নাগরিক ও নারী হওয়ায় বাঁধনকে সহজ টার্গেট করা হয়েছে।
গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বাঁধনের ওপর হামলার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, বাঁধনের ‘অপরাধ’ ছিল একটি গণ-অভ্যুত্থানে তার অবস্থান, যা হামলাকারীদের আদর্শের সাথে মেলেনি।
দীপ্তি চৌধুরী আরো লেখেন, বাঁধন রাষ্ট্রীয়ভাবে শিশুহত্যার প্রতিবাদে রাজপথে ছিলেন এবং তার প্রোফাইল লাল করেছিলেন। কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় না থাকায় এবং একজন নারী হওয়ায় তাকে সহজ টার্গেট করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে জুলাই আন্দোলনের অংশীদারত্ব দাবি করা রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দীপ্তি। তিনি লেখেন, জুলাইয়ের অংশীদারত্ব নিয়ে টানাটানি করা রাজনৈতিক দলগুলো এ ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের নতুন উদ্বেগ
বাঁধনের ওপর হামলার অভিযোগকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি নতুন করে সামনে এসেছে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশীদের মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের বিষয়টি। একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে যাওয়া একজন শিল্পীকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে হামলার অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে, তাদের বক্তব্য এবং ইতালির স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বাঁধনের করা অভিযোগ, প্রকাশিত ভিডিও এবং স্থানীয় পুলিশের তদন্ত- এই তিনটি বিষয়ই ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



